এসএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণে রেকর্ড আবেদন: ১৩ লাখ খাতা পুনরায় মূল্যায়নের চ্যালেঞ্জে শিক্ষা বোর্ড

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

এ বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফল নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছে ৪ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী। সব মিলিয়ে প্রায় ১৩ লাখ খাতা নতুন করে দেখার জন্য আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে তত্ত্বীয় বা লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্রের জন্য আবেদন পড়েছে ১০ লাখ ৫৬ হাজারের বেশি। অন্যদিকে ব্যবহারিক পরীক্ষার খাতার জন্য আবেদন জমা পড়েছে ২ লাখ ৩১ হাজারের বেশি। এত বিশাল সংখ্যক খাতা পুনরায় মূল্যায়ন করা শিক্ষা বোর্ডগুলোর জন্য একটি পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১০ আগস্ট ফলাফল প্রকাশের পর ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে এই আবেদন গ্রহণ করা হয়।

বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার ফল পুনর্নিরীক্ষণের নিয়মে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে কেবল উত্তরপত্রের প্রাপ্ত নম্বরের যোগ-বিয়োগ ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হতো। একে বলা হতো পুনর্নিরীক্ষণ। কিন্তু এবার উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও দীর্ঘদিনের দাবির মুখে উত্তরপত্র পুরোপুরি ‘পুনর্মূল্যায়ন’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ডগুলো। এর মানে হলো, পরীক্ষক কোনো প্রশ্নে নম্বর দিতে ভুল করেছেন কি না বা কোনো প্রশ্নের উত্তর না দেখেই এড়িয়ে গেছেন কি না, তা একজন নতুন পরীক্ষক দিয়ে পুনরায় যাচাই করা হবে। এই পদ্ধতি চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা বেড়েছে, তেমনি বোর্ডের ওপর কাজের চাপ বেড়েছে প্রায় ১০০%।

এবারের এসএসসিতে পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এই বিপুল আবেদনের অন্যতম প্রধান কারণ। ১১টি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে এবার গড় পাসের হার ৬২.২৫%, যার মানে হলো প্রায় ৩৮% পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। শুধু ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৬৪.০৫ শতাংশে, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ হাজার কমেছে। পাসের হার কমে যাওয়ায় এবং জিপিএ-৫ না পাওয়ায় সংক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দলে দলে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছে। সব মিলিয়ে ১১টি বোর্ডের ৪ লাখ ২ হাজার ৫১ জন পরীক্ষার্থী মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি আবেদন জমা দিয়েছে।

আবেদনের সংখ্যায় বরাবরের মতো শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডের ৯৪ হাজার ২৩৬ জন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষার জন্য ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য ৫৮ হাজার ১২টি আবেদন করেছে। অন্যান্য বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী বোর্ডে ৩৯ হাজারের বেশি, চট্টগ্রামে ৩৯ হাজারের বেশি, কুমিল্লায় ৩৫ হাজারের বেশি এবং দিনাজপুরে ৩৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪০ হাজারের বেশি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডেও ২০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী ফল পরিবর্তনের আশায় আবেদন করেছে।

শিক্ষা বোর্ডগুলো এখন এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, যেহেতু এবার খাতা নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে, তাই তাদের প্রচুর সংখ্যক অভিজ্ঞ পরীক্ষক নিয়োগ দিতে হচ্ছে। সাধারণত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফলাফল দিতে গিয়ে পরীক্ষকরা অনেক সময় তাড়াহুড়ো করেন, যার খেসারত দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। গত বছর ঢাকা বোর্ডেই পুনর্নিরীক্ষণের পর নতুন করে ২৮৬ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল এবং ২৯৩ জন ফেল থেকে পাস করেছিল। এবার পূর্ণাঙ্গ পুনর্মূল্যায়ন হওয়ায় এই সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, মানসম্মত পরীক্ষকের অভাব এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে অবহেলার কারণেই প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো প্রশ্নের উত্তরের জন্য পরীক্ষক ১ নম্বরও দেননি, অথচ সেখানে ৩ বা ৪ পাওয়ার সুযোগ ছিল। এমন ভুলের কারণে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। তাই এবার বোর্ডগুলো তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে। তারা চায় না কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন বোর্ডের গাফিলতির কারণে নষ্ট হোক। প্রতিটি খাতা নির্ভুলভাবে দেখার জন্য এবার বিশেষ সফটওয়্যার ও ডাটাবেজ ব্যবহার করা হচ্ছে।

আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই পুনর্নিরীক্ষণের ফলাফল প্রকাশ করার চেষ্টা করছে বোর্ডগুলো। যদি সময়মতো ফলাফল না আসে, তবে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পছন্দের কলেজে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, তারা দিনরাত কাজ করছেন যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই চূড়ান্ত সংশোধিত ফলাফল শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া যায়। এই বিপুল সংখ্যক খাতা দেখার জন্য বোর্ডগুলোর লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়াতে সরকার বাড়তি ফান্ডও বরাদ্দ করেছে।

সব মিলিয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণ একটি বড় প্রশাসনিক পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে। সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকরা আশা করছেন, এবার অন্তত সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের যোগ্য ফল ফিরে পাবে। শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বোর্ডগুলোকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ পরীক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ভুলের মাত্রা ০% এ নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ