নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপে একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়েছে। গত রোববার (১৬ আগস্ট) উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের শেখেরগাঁও গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের জীবন নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে উপজেলা প্রশাসন যে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে, তা এলাকায় বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। নবম শ্রেণির একজন ছাত্রীকে জোর করে বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর আয়োজন প্রায় ১০০% সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রশাসনের অভিযানে পণ্ড হয়ে যায় সব পরিকল্পনা।
ঘটনার বিস্তারিত জানলে দেখা যায়, শেখেরগাঁও গ্রামের মৃত হাসিমুদ্দিনের মেয়ে তানজিমার (১৫) সঙ্গে বিয়ের কথা ঠিক হয়েছিল পাশের গজারিয়া গ্রামের মৃত আব্দুল হেকিমের ছেলে আজহারুলের (২২)। তানজিমা স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর হলেও তানজিমার বয়স ছিল তার চেয়ে ৩ বছর কম। কিন্তু পরিবারের লোকজন আইনি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করেছিল। বাড়িতে মেহমানদের আনাগোনা এবং রান্নাবান্নার কাজও পুরোদমে চলছিল।
গোপন সূত্রে এই খবরটি পৌঁছে যায় মনোহরদী উপজেলা প্রশাসনের কাছে। খবর পাওয়ার পরপরই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সজিব মিয়া সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর সঙ্গীয় ফোর্স এবং উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রেহানা আক্তারকে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। প্রশাসনের গাড়ি দেখে বিয়ের প্যান্ডেলে হইচই পড়ে যায় এবং অনেকে সটকে পড়ার চেষ্টা করেন। তবে এসিল্যান্ড সরাসরি কনের বাড়িতে ঢুকে বিয়ের সকল কার্যক্রম স্থগিত করার নির্দেশ দেন।
অভিযানকালে এসিল্যান্ড সজিব মিয়া কনের জন্মসনদ যাচাই করেন এবং নিশ্চিত হন যে মেয়েটির বয়স এখনো ১৮ বছর হয়নি। তিনি মেয়ের মা আছমা খাতুন এবং হবু বর আজহারুলকে বাল্যবিবাহের কুফল ও আইনি শাস্তির বিষয়ে বিস্তারিত বুঝিয়ে বলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এই বিয়ে সম্পন্ন করা হলে জড়িত সবার জেল এবং বড় অংকের জরিমানা হতে পারে। এরপর বরের পরিবার ও মেয়ের মা তাদের ভুল বুঝতে পারেন এবং ভুল স্বীকার করেন।
এ সময় এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সামনে বর আজহারুল এবং কনের মা আছমা খাতুনের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা গ্রহণ করেন। মুচলেকায় তারা অঙ্গীকার করেন যে, তানজিমার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে তারা তাকে কোনোভাবেই বিয়ে দেবেন না। এছাড়া তানজিমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্যও পরামর্শ দেওয়া হয়। এই অভিযানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, যারা প্রশাসনের এই কাজকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
আর্থিক দিক দিয়ে বিচার করলে, এই বিয়ের আয়োজনে দুই পরিবার মিলে প্রায় ১,৫০,০০০ টাকা বা প্রায় ১২৫০$ ডলারের মতো খরচ করেছিল। কিন্তু অশিক্ষার কারণে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকায় তাদের এই বিশাল টাকা লোকসান হলো। গ্রামীণ সমাজে এখনো প্রায় ২০% থেকে ৩০% মানুষ মনে করে মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, যা আসলে সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ধরণের অভিযানের ফলে এলাকাবাসীর মধ্যে একটি কড়া বার্তা পৌঁছেছে যে, বাল্যবিবাহ দিলে প্রশাসনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ সজিব মিয়া গণমাধ্যমকে জানান, “বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক অভিশাপ। এটি কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। মনোহরদী উপজেলা প্রশাসন বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সব সময় জিরো টলারেন্স নীতি পালন করবে। আমরা চাই প্রতিটি মেয়ে যেন তাদের শিক্ষা পূর্ণ করতে পারে এবং দেশের সম্পদে পরিণত হয়।” তিনি আরও জানান, এই ধরণের ঝটিকা অভিযান উপজেলার প্রতিটি গ্রামে নিয়মিত চলবে।
বর্তমানে তানজিমা তার পরিবারের সাথেই আছে এবং সে পুনরায় স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রশাসনের এমন নজরদারি থাকলে গ্রামে বাল্যবিবাহের হার ০% এ নামিয়ে আনা সম্ভব। এই সফল অভিযানের ফলে মনোহরদী এলাকায় সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং তারা প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। একটি সুন্দর ও শিক্ষিত সমাজ গড়তে হলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করার কোনো বিকল্প নেই।
















