দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে গত কয়েকদিন ধরেই ব্যাপক আলোচনা চলছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে শনিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই বৈঠকে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দেশের আগামী রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, সেই গুরুদায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করেছেন। অর্থাৎ, তারেক রহমান যাকে যোগ্য মনে করবেন, তিনিই হবেন বিএনপির রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী।
শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বৈঠক শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঠিক করার জন্য ১০০% ক্ষমতা দলের চেয়ারম্যানের হাতে অর্পণ করেছে। মহাসচিব আরও বলেন, আজকের বৈঠকে কেবল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নয়, বরং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রশাসনিক কাঠামো এবং সরকারের চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে দলের অংশগ্রহণ এবং কৌশল নিয়ে নেতারা তাদের মতামত তুলে ধরেছেন।
বৈঠকের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানা গেছে, গত ২৪ জুলাই সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর থেকে রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য রয়েছে। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের নিয়ম হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির পদ খালি হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন ভোটের তারিখ ঘোষণা করবে এবং সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করবেন। যেহেতু বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবচেয়ে বেশি, তাই তাদের মনোনীত প্রার্থীই আগামী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেবেন—এটা প্রায় নিশ্চিত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করলেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। যদি নির্বাচনের জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রয়োজন পড়ে, তবে স্পিকারের সাথে আলোচনা করে সরকার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রপতির মতো একটি সম্মানিত পদে এমন একজনকে আনা প্রয়োজন যিনি দেশের সংবিধান ও গণতন্ত্রের প্রতি শতভাগ অনুগত থাকবেন। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কাজের গতি ১০-২০% বৃদ্ধি করতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে একজন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রপতির বিকল্প নেই।
গুলশানের এই বৈঠকে দলের প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি ও সরাসরি বৈঠকে অংশ নেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সেলিমা রহমানের মতো শীর্ষ নেতারা। এছাড়া বৈঠকে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। দলের সকল সিনিয়র নেতা একমত হয়েছেন যে, এই মুহূর্তে দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত এবং দলের সবাই সেই সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের ওপর এই দায়িত্ব অর্পণ করার মাধ্যমে বিএনপি তাদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও নেতার প্রতি আস্থার বিষয়টি পুনরায় প্রমাণ করল। রাষ্ট্রপতি পদে কার নাম চূড়ান্ত হবে, তা নিয়ে দলের ভেতরে ৫-১০ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা থাকলেও শেষ পর্যন্ত চমক আসতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের নজর এখন বিএনপির চেয়ারম্যানের দিকে। তিনি কি কোনো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে এই পদে বসাবেন, নাকি কোনো পেশাজীবী বা বিচার বিভাগীয় ব্যক্তিত্বকে বেছে নেবেন, তা জানতে আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে।
বৈঠক শেষে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করি। দেশের মানুষ এখন একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ চায়। সরকার যেভাবে দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছে, নতুন রাষ্ট্রপতি সেই পথকে আরও সুগম করবেন বলে আমরা আশা রাখি। বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে, কারণ দীর্ঘ সময় পর দলটি তাদের পছন্দের রাষ্ট্রপতিকে বঙ্গভবনে দেখতে যাচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত ৯০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই এই নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন বঙ্গভবনের পরবর্তী উত্তরসূরিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। যেহেতু সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা সরাসরি না থাকলেও তিনি রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি, তাই এই নির্বাচনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান খুব দ্রুতই তার সিদ্ধান্তের কথা স্থায়ী কমিটিকে জানাবেন এবং এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে। দেশবাসী এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
















