মৌলভীবাজারের শিক্ষা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রবীণ শিক্ষাবিদ এবং আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর আব্দুর রহিম খান চিরবিদায় নিয়েছেন। গত ২৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। স্থানীয় সময় বিকেল ৫:৪০ মিনিটে এই বরেণ্য ব্যক্তিত্ব মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার মৃত্যুর সংবাদটি আইবিএননিউজ ও বাপসনিউজসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে। মৌলভীবাজারের ঘড়ুয়া গ্রামের এই কৃতি সন্তানের বিদায়ে দেশ ও প্রবাসে বসবাসরত মৌলভীবাজারবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আব্দুর রহিম খান তার দীর্ঘ কর্মজীবনে শত শত শিক্ষার্থীকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। তিনি মৌলভীবাজার মডেল স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৪ সালে তিনি সরকারের পক্ষ থেকে ‘শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক’ হিসেবে স্বর্ণপদক ও সম্মাননা লাভ করেন। তার পড়ানোর ধরণ এবং ছাত্রদের প্রতি মমত্ববোধ ছিল ১০০% প্রশংসনীয়। তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, বরং একজন অভিভাবক হিসেবেও শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তার হাতে গড়া বহু শিক্ষার্থী আজ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উচ্চপদে আসীন থেকে দেশের সেবা করছেন।
পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ সময় অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সাথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিক্ষক সমাজের মানোন্নয়ন এবং প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামোগত পরিবর্তনে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তিনি সবসময় বলতেন, একটি জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করতে হলে প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তার এই আদর্শিক অবস্থান আজও জেলার প্রবীণ শিক্ষকদের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
পারিবারিক জীবনে আব্দুর রহিম খান ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক এবং সদালাপী একজন মানুষ। তিনি নিউইয়র্ক প্রবাসী জনপ্রিয় সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও পরিচিত মুখ জুবায়ের খান জুয়েলের পিতা। গত বুধবার বিকেলে যখন তার মৃত্যুর খবরটি পৌঁছায়, তখন ব্রঙ্কসের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের আবহ তৈরি হয়। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি প্রবাসে থাকলেও তার মন পড়ে থাকত আজন্ম চেনা মৌলভীবাজারের মাটিতে। মৃত্যুকালে তিনি পরিবার-পরিজন, অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন এবং হাজার হাজার গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার এই শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক, মৌলভীবাজার ডিস্ট্রিক্ট ডেভেলপমেন্ট এন্ড ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন অব ওয়ালর্ড ওয়াইড-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ইউকে বিডি টিভির চেয়ারম্যান মকিস মনসুর এক শোকবার্তায় গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আব্দুর রহিম খান স্যার ছিলেন একজন চলন্ত ডিকশনারি এবং মানবতার মূর্ত প্রতীক। তিনি আমাদের জেলার শিক্ষা প্রসারে যে ভূমিকা রেখেছেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার হাসি মাখা মুখ আর সৎ পরামর্শ আমরা খুব মিস করব। আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই শোক সইবার শক্তি দেন।”
মকিস মনসুর আরও বলেন, আব্দুর রহিম খানের মতো শিক্ষাবিদদের জীবনী বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা উচিত। তিনি সমাজসেবা ও শিক্ষাকে যেভাবে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিয়েছিলেন, তা বর্তমান সময়ে বিরল। শোকবার্তায় তিনি দেশ-বিদেশে বসবাসরত সকল মৌলভীবাজারবাসীকে মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন। সাংবাদিক মকিস মনসুর ব্যক্তিগতভাবে মরহুমের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে সান্ত্বনা প্রদান করেন এবং তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।
বর্তমানে মরহুম আব্দুর রহিম খানের দাফনের প্রস্তুতি নিউইয়র্কে সম্পন্ন হচ্ছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। তার জানাজায় ব্রঙ্কস ও পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকশ প্রবাসী বাংলাদেশি অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি ছিলেন একজন শ্রদ্ধার পাত্র। মৌলভীবাজারের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, রহিম স্যারের মৃত্যুতে জেলাটি একজন অভিভাবক হারাল। তার আদর্শ ও কর্মের মাধ্যমে তিনি আমাদের মাঝে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
পরিশেষে বলা যায়, আব্দুর রহিম খানের মতো মানুষদের মৃত্যু হয় না, তারা তাদের কর্মের মাঝে অমর হয়ে থাকেন। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তিনি যে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন, তা আগামী ১০০ বছর পর্যন্ত মানুষের মনে গেঁথে থাকবে। তার প্রয়াণে শিক্ষা জগতের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। শোকের এই কঠিন সময়ে আমরা সবাই তার পরিবারের পাশে আছি এবং পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে তার বিদেহী আত্মার জন্য প্রার্থনা করছি।
















