নির্বাচনের মুখে কঠিন চাপে ট্রাম্প: হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন পাহারায় থাকা ট্যাংকারে ইরানের হামলা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সামাল দিতে বৈঠকে বসেছেন, ঠিক তখনই উত্তাল হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। মার্কিন বাহিনীর কড়া পাহারায় থাকা দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে শক্তিশালী হামলা চালিয়েছে ইরান। শুক্রবার ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সরাসরি জানিয়েছে যে, তাদের নীতি অমান্য করায় তারা জাহাজ দুটিতে আঘাত হেনে থামিয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই থমথমে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর পাহারায় থাকা আরও ৪টি জাহাজ ধ্বংস হওয়ার ভয়ে মাঝপথ থেকে ফিরে গেছে। তেলের এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি এখন আক্ষরিক অর্থেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

বিপজ্জনক এই উত্তেজনার কারণে গত ২ সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালিতে সাধারণ জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের পকেটে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতিমধ্যেই প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশই এখন পাল্টাপাল্টি অবস্থানে। ওমান উপকূলের একটি বিশেষ পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোতে ইরান নিয়মিত বোমাবর্ষণ করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও বসে নেই; তারা ইরানের বন্দর ও বিভিন্ন জাহাজে অবরোধ জারি করে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। দুই দেশের এই জেদের লড়াইয়ে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্রতর হচ্ছে।

লড়াই এখন আর শুধু সমুদ্রের তেলের ট্যাংকারে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান ড্রোন পাঠালেও তারা সেগুলো ভূপাতিত করতে পেরেছে। এতে কোনো প্রাণহানি না হলেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে পুরো অঞ্চলে। অন্যদিকে, লেবাননের প্রাচীন বিউফোর্ট দুর্গের কাছে বিশাল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা হিজবুল্লাহর মাটির নিচের টানেল ও গোপন আস্তানা ধ্বংস করেছে। তবে লেবানন সরকার একে সরাসরি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। বিকট সেই বিস্ফোরণে পুরো এলাকা ছাই আর ধুলোয় মিশে গেছে, যা দক্ষিণ লেবাননের মানুষের মনে নতুন করে যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে।

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই যুদ্ধের কারণে দেশটিতে গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের জয়ের পথ বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে যখন মন্ত্রিসভার সদস্যরা ‘মজার’ অভিজ্ঞতার আশায় বৈঠকে মিলিত হয়েছেন, তখন সাধারণ মার্কিনীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। রয়টার্স-ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৩% বা প্রতি ৩ জন আমেরিকানের মধ্যে মাত্র ১ জন এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটিই সর্বনিম্ন জনসমর্থন। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের সিনেটে যুদ্ধ বন্ধের একটি প্রস্তাব মাত্র ১ ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছে, যেখানে ৫০ জন বিপক্ষে এবং ৪৯ জন পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

সাধারণ মানুষ যখন মূল্যস্ফীতিতে হাঁসফাঁস করছে, তখন বড় বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো যুদ্ধের সুযোগে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করছে। তথ্যানুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এক্সনমবিলের মুনাফা দ্বিগুণ বা ২০০% বেড়েছে। আরও অবাক করা বিষয় হলো, আরেক তেল জায়ান্ট শেভরন জানিয়েছে যে তাদের মুনাফা বেড়েছে ৫ গুণেরও বেশি। তেলের এই চড়া দাম ডেমোক্র্যাটদের জন্য রাজনৈতিক আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। তারা আশা করছে, দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতিকে পুঁজি করে তারা রিপাবলিকানদের কাছ থেকে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে পারবে। ট্রাম্প শুরুতে কথা দিয়েছিলেন এই যুদ্ধ মাত্র কয়েক সপ্তাহ চলবে, কিন্তু দেখতে দেখতে ৫ মাস পার হয়ে গেলেও থামার কোনো লক্ষণ নেই।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন পর্যন্ত এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ট্রাম্প শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি সচল রাখার চেষ্টা করলেও বাস্তবে তার কোনো সুফল দেখা যাচ্ছে না। তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া এবং জনসমর্থন কমে যাওয়া এই দুই সংকট এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামনে নির্বাচন হওয়ায় হোয়াইট হাউসকে এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ক্যাম্প ডেভিডের বৈঠকের দিকে, যেখান থেকে হয়তো এই সংকটের কোনো নতুন সমাধান বা যুদ্ধের নতুন কোনো ভয়াবহ দিক বেরিয়ে আসতে পারে।

Donald-Trump

সম্পর্কিত নিবন্ধ