ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং মাদক নির্মূলে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন। গত কয়েক দিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পরিচালিত এই অভিযানে মাদক কারবারি, সেবনকারী, ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি এবং দাঙ্গা সৃষ্টির চেষ্টাকারীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই যৌথ তৎপরতায় এলাকায় অপরাধের মাত্রা অন্তত ১৫% থেকে ২০% কমে আসবে বলে ধারণা করছে সচেতন মহল। অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লার নেতৃত্বে এই বিশেষ অভিযানগুলো পরিচালিত হয়।
অভিযানে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে মাদক নিয়ন্ত্রণে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে কয়েকশ পিস ইয়াবাসহ একাধিক পেশাদার মাদক ব্যবসায়ীকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে রয়েছে কবিরপুর গ্রামের শ্রী সঞ্জিত কর্মকারের কাছ থেকে ১৪৩ পিস ইয়াবা এবং নগদ ১,৭৯০ টাকা উদ্ধার। এছাড়া আসাননগর এলাকায় একটি পরিত্যক্ত মোটরসাইকেল তল্লাশি করে ১৭৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে পুলিশ। মাদক ব্যবসার এই জাল ছিঁড়তে পুলিশ গত এক সপ্তাহে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি পৃথক অভিযান চালায়। অভিযানে দেখা গেছে, ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রির হার আগের চেয়ে ১০% বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা ছিল, যা পুলিশের তৎপরতায় নস্যাৎ হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচার ও দণ্ড প্রদানের ঘটনা ছিল নজরকাড়া। ২ নং চাঁদপুর গ্রামের পলাশ হোসেনকে ২ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একইভাবে মাদক সেবনের দায়ে তামিম হোসেন, বান্না ও তামিম ইকবালকে ১ মাস করে সাজা দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ধাওড়া গ্রামের রাসেল ও আসিফকে ৩ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। চন্ডিপুরের অমিত কুমার দাসকে মাদক সেবনের দায়ে সর্বোচ্চ ১ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানার পরিমাণ ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০০ টাকা পর্যন্ত ধার্য করা হয়েছে, যা অপরাধীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করতে সহায়তা করবে।
শৈলকূপার গ্রাম্য দাঙ্গা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়াতে পুলিশ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে। ৯ নং মনোহরপুর ও ১০ নং বগুড়া ইউনিয়নে চালানো অভিযানে মোট ২১টি ঢাল, ২৭টি ফালা (সরকি), রামদা, চাপাতি ও হাতুড়ি জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এসব অস্ত্র দিয়ে বড় ধরনের দাঙ্গা বা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সময়মতো অস্ত্রগুলো উদ্ধার হওয়ায় ওই এলাকাগুলোতে শান্তি ফিরে এসেছে। গ্রাম্য মাতবরদের প্ররোচনায় দাঙ্গা সৃষ্টির প্রবণতা শৈলকূপায় দীর্ঘদিনের সমস্যা, যা দমনে পুলিশ এখন ৯০% কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামিদের ধরতেও পুলিশ বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। মেহেন্দীগঞ্জ থানার একাধিক মামলার আসামি মোঃ এনামুল হক শিকদারকে তার নিজ বাড়ি কুশবাড়ীয়া থেকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া উলুবাড়ীয়া গ্রাম থেকে জিআর মামলার আসামি ইমরান শিকদারকেও আটক করেছে পুলিশ। শুধু তাই নয়, পৌর এলাকার মাছ বাজারে চিৎকার-চেঁচামেচি করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির দায়ে পুলিশ আইনের ৩৪ ধারায় তিনজনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠিয়েছে। পুলিশের এই অলরাউন্ডার পারফরম্যান্সে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
জুলাই মাসের এই দীর্ঘ অভিযানে পুলিশ কেবল মাদক ও অস্ত্রই নয়, অনলাইন জুয়াড়িদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে। কবিরপুর এলাকা থেকে অনলাইন জুয়া খেলার সময় মিথুন নামের এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওসি হুমায়ূন কবির মোল্লা জানান, শৈলকূপাকে একটি আধুনিক ও অপরাধমুক্ত উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। অপরাধের ধরন যাই হোক না কেন, দোষীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ ১০০% সচেষ্ট। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের অভিযান আগামী দিনগুলোতেও নিয়মিতভাবে চলবে এবং কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।
















