কমলগঞ্জ প্রতিনিধি (মৌলভীবাজার):
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগরে পুলিশের এক সাহসী অভিযানে একটি অবৈধ একনালা পাইপগান উদ্ধার হয়েছে। এই ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে পুরো এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের চাপা উদ্বেগ আর আতঙ্ক বিরাজ করছে। জনবহুল একটি জায়গার সামনে কীভাবে এমন ভয়ানক মারণাস্ত্র এলো এবং কারা এটি কেনাবেচার চেষ্টা করছিল, তা নিয়ে এখন সবার মনেই প্রশ্ন। পুলিশ বলছে, তারা অপরাধীদের ডালপালা উপড়ে ফেলতে কাজ শুরু করেছে এবং এলাকায় নিরাপত্তা ১০০% নিশ্চিত করতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
অস্ত্র উদ্ধারের এই ঘটনাটি ঘটে গত ২৮ জুলাই রাত ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে। পুলিশ গোপন সূত্রের মাধ্যমে খবর পায় যে, শমশেরনগর রাজমহলের সামনে কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি অস্ত্র কেনাবেচার পরিকল্পনা করছে। খবর পাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের নেতৃত্বে একটি চৌকস দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে অপরাধীরা তাদের কাছে থাকা অস্ত্রটি ফেলে রেখে দ্রুত অন্ধকারে মিশে যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়ে রাস্তার পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় সেই একনালা পাইপগানটি উদ্ধার করে।
উদ্ধার করা এই অস্ত্রের পেছনে কার হাত আছে, তা জানতে পুলিশ দ্রুত তদন্তে নামে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, শংকরপুর গ্রামের শরিফ মিয়ার ছেলে ২৩ বছর বয়সী শাহান মিয়া এই ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত। পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, শাহান মিয়া দীর্ঘ দিন ধরেই এলাকায় নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযানের সময় সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও পুলিশ তাকে ধরার জন্য সম্ভাব্য সব জায়গায় হানা দিচ্ছে। এলাকাবাসী মনে করছেন, এই চক্রের সাথে আরও অন্তত ২ থেকে ৩ জন জড়িত থাকতে পারে।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় ইতিমধ্যে শমশেরনগর থানায় একটি অস্ত্র মামলা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা পাইপগানটি স্থানীয়ভাবে তৈরি হলেও এটি যেকোনো মানুষের প্রাণনাশের জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী। সাধারণত এই ধরনের অবৈধ অস্ত্রের ৯০% ব্যবহারই হয় চাঁদাবাজি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার বা বড় ধরনের ডাকাতির কাজে। পুলিশ এই অস্ত্রের মূল উৎস খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই অস্ত্রটি হয়তো সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাচার হয়ে এসেছে, যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৫০০ থেকে ৭০০ ডলারের সমপরিমাণ হতে পারে।
শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মাসুদ পারভেজ এই বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা খবর পাওয়া মাত্রই অ্যাকশন নিয়েছি। অপরাধীরা পালিয়ে গেলেও আমরা মারণাস্ত্রটি উদ্ধার করতে পেরেছি, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় একটি সাফল্য। পলাতক আসামি শাহান মিয়াকে আইনের আওতায় আনতে আমাদের তল্লাশি অভিযান অব্যাহত আছে।” তিনি আরও জানান, অপরাধীদের দমনে তারা কোনো আপস করবেন না এবং এলাকাবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে পুলিশকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করার আহ্বান জানান।
মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি চুরিবাজির পাশাপাশি এই ধরনের অস্ত্র উদ্ধার সাধারণ মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। স্থানীয়দের মতে, রাতের আঁধারে রাজমহলের মতো জনাকীর্ণ স্থানে অস্ত্রের লেনদেন হওয়া মানে অপরাধীরা বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত কয়েক মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোটখাটো অপরাধের প্রবণতা প্রায় ১০% থেকে ১২% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পাইপগানটি হয়তো কোনো বড় অপরাধ সংঘটনের জন্য হাতবদল হওয়ার কথা ছিল, যা পুলিশের তৎপরতায় নস্যাৎ হয়ে গেল।
স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং বাসিন্দারা এই সফল অভিযানের জন্য পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে তারা একই সাথে এলাকায় স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। শমশেরনগর বাজারের একজন ব্যবসায়ী বলেন, “রাত ১০টার পর এলাকায় পুলিশের টহল অন্তত ৩০% বাড়ানো দরকার। যদি পুলিশ সময়মতো না পৌঁছাত, তবে হয়তো কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেত।” স্থানীয় জনতা দাবি করেছে, শুধু শাহান মিয়া নয়, এর পেছনে থাকা বড় কারবারিদেরও যেন পুলিশ খুঁজে বের করে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি পাইপগান উদ্ধার হয়তো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হতে পারে, কিন্তু এটি একটি বড় সংকটের সংকেত। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, তারা পুরো উপজেলাজুড়ে চিরুনি অভিযান চালাবে যাতে আর কোনো অবৈধ অস্ত্র কারো হাতে না থাকে। শান্তিপ্রিয় শমশেরনগরে অপরাধীদের কোনো স্থান হবে না এমনটাই প্রত্যাশা সবার। পলাতক আসামিদের ধরতে পুলিশ এখন জালের মতো নজরদারি সাজিয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
















