মো. আল আমিন, দীঘিনালা,
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলে দিতে এক বিশেষ প্রশাসনিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপজেলার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন (WASH) সেবা নিশ্চিত করার লক্ষে একটি নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকালে উপজেলা পরিষদের সেমিনার কক্ষে জাবারাং কল্যাণ সমিতি এই ‘প্রকল্প অবহিতকরণ সভা’ আয়োজন করে। এই সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘অ্যাক্সেস টু অ্যান্ড ইউটিলাইজেশন অব লাইফসেভিং সার্ভিসেস বাই মার্জিনালাইজড কমিউনিটিজ ইন চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের লক্ষ্য ও কার্যক্রম সবার সামনে তুলে ধরা।
সভার শুরুতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিল পারভেজ প্রকল্পের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, পাহাড়ি এলাকার প্রান্তিক মানুষের কাছে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা অন্তত ৯০% লক্ষ্যভুক্ত পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চাই। বিশেষ করে পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় যেখানে বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট, সেখানে এই প্রকল্পের আওতায় নতুন পানির উৎস তৈরি করা হবে। তিনি আরও জানান যে, প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসন থেকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে যাতে এই এলাকার মানুষের গড় আয়ু ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
প্রকল্পের বিস্তারিত আলোচনায় জানানো হয়, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই কর্মসূচি বিশেষ ভূমিকা রাখবে। জাবারাং কল্যাণ সমিতির প্রকল্প পরিচালক বিনোদন ত্রিপুরার সভাপতিত্বে সভায় জানানো হয়, প্রকল্পের মোট বাজেটের প্রায় ৩৫% বরাদ্দ রাখা হয়েছে নিরাপদ স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির উৎস স্থাপনের জন্য। এছাড়া গর্ভবতী নারী ও শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে ২০% অর্থ ব্যয় করা হবে বিশেষ খাদ্য সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে। সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ করতে পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এলাকার শিশু মৃত্যুর হার অন্তত ১০% কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান সুমন এবং জনস্বাস্থ্য কার্যালয়ের উপ-প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম সরকার। তারা বলেন, কেবল স্বাস্থ্যসেবা দিলেই হবে না, বরং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষের হার ১০০% এ উন্নীত করতে হবে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী জানান, উন্নত ওয়াশ (WASH) ব্যবস্থার মাধ্যমে পানিবাহিত রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তিনি আরও যোগ করেন যে, এলাকার অন্তত ৭৫% মানুষকে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহারের আওতায় আনা প্রকল্পের অন্যতম বড় লক্ষ্য। এর ফলে এলাকার সার্বিক পরিবেশের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর সিনিয়র নিউট্রিশন অফিসার রিমি চাকমা এবং জীবিকায়ন কর্মকর্তা মালাখিন মারমা সভায় প্রকল্পের কারিগরি দিকগুলো ব্যাখ্যা করেন। তারা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক কারণে অনেক সময় প্রান্তিক মানুষ সরকারি সেবার বাইরে থেকে যায়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করা হবে। মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে যাতে প্রকল্পটি দীর্ঘস্থায়ী সুফল দেয়। তারা আরও জানান, প্রকল্পের কাজের স্বচ্ছতা যাচাই করার জন্য প্রতি মাসে একটি করে মনিটরিং রিপোর্ট তৈরি করা হবে এবং তা অনলাইনে প্রকাশ করা হবে।
সভায় উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরৎ কুমার ত্রিপুরা এবং এফআইভিডিবির (FIVDB) প্রতিনিধি অনিরুদ্ধ কুমার সরকারও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। তারা বলেন, স্থানীয় বাজারগুলোর সাথে প্রান্তিক কৃষকদের সংযোগ স্থাপন করে দিতে পারলে তাদের আয় অন্তত ১৫% থেকে ২০% বৃদ্ধি পাবে। এতে করে তাদের খাদ্য কেনার সক্ষমতা বাড়বে। মনিটরিং অফিসার শুভ রঞ্জন ত্রিপুরা পুরো প্রক্রিয়াটির তদারকি নিয়ে আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হবে যাতে কোনো প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত মানুষ তালিকা থেকে বাদ না পড়ে।
উপসংহারে সভাপতি বিনোদন ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দীঘিনালার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অঞ্চলটি একদিন স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধিতে রোল মডেল হয়ে উঠবে। সভা শেষে উপস্থিত সবাইকে প্রকল্পের লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
















