ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মার্কিন অস্ত্রভান্ডার কি সত্যিই খালি হয়ে যাচ্ছে? ট্রাম্পের কপালে চিন্তার ভাঁজ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

পেনসিলভানিয়ায় আয়োজিত প্রতিরক্ষা ও উদ্ভাবন সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন শীর্ষ অস্ত্র নির্মাতাদের সাথে মঞ্চে ওঠেন, তখন তার মুখে ছিল কেবল একটিই বার্তা‘আরও দ্রুত অস্ত্র বানাতে হবে’। গত ৪ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রভাবে মার্কিন অস্ত্রাগারে এখন বড় ধরনের টান পড়েছে। ইরানের সাথে টানা ৪০ দিনের বিধ্বংসী যুদ্ধে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই বিশাল অর্থের সিংহভাগই ব্যয় হয়েছে দামী ক্ষেপণাস্ত্র এবং গোলাবারুদের পেছনে। হোয়াইট হাউসের তথ্যমতে, এই যুদ্ধের সময় মার্কিন বাহিনী ইরানের ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে। এর বিপরীতে ইরানও প্রায় ১ হাজার ৭০০ ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যা সামাল দিতে পেন্টাগনকে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে।

যুদ্ধের ময়দানে ‘টমাহক’ ক্ষেপণাস্ত্র হলো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শক্তি। সামরিক গবেষকরা জানিয়েছেন, এই এক যুদ্ধেই মার্কিন নৌবাহিনী ১ হাজারের বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে। যার একেকটির দাম প্রায় ২৬ লাখ ডলার ($)। উদ্বেগের বিষয় হলো, যে হারে এই ক্ষেপণাস্ত্র খরচ হয়েছে, তাতে ২০৩১ সালের আগে মার্কিন গুদামগুলোতে আগের মতো পর্যাপ্ত মজুত ফিরে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ একেকটি আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সেনেটে জানিয়েছেন, জরুরি ভিত্তিতে এই ঘাটতি মেটাতে তাদের এখন আরও ৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের বিশাল অংকের বরাদ্দ প্রয়োজন।

শুধু আক্রমণ নয়, ইরানের ড্রোন হামলা ঠেকাতেও বিপুল অর্থ খরচ হয়েছে। প্যাট্রিয়ট মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৩০টি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। অথচ যুদ্ধের আগে তাদের হাতে ছিল মাত্র ২ হাজার ৩৩০টি। প্রতিটি প্যাট্রিয়ট মিসাইলের দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার। অথচ ইরানের একটি ড্রোনের উৎপাদন খরচ মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। অর্থাৎ একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১০০ গুণ বেশি টাকা খরচ করছে। এছাড়া থাড (THAAD) নামের উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও এখন তলানিতে ঠেকেছে। ৩৬০টি থাড মিসাইলের মধ্যে ইতিমধ্যে প্রায় ২৯০টি শেষ হয়ে গেছে, যা মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অন্তত ১৫% থেকে ২০% দুর্বল করে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মার্কিন অস্ত্রাগার এভাবে খালি হতে থাকায় সবচেয়ে বেশি চিন্তায় পড়েছে তাইওয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নীতিনির্ধারকরা। চীনের তাইওয়ান আক্রমণের আশঙ্কাকে সামরিক ভাষায় ‘ডেভিডসন উইন্ডো’ বলা হয়। গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর মতে, ২০২৭ সালের মধ্যে চীন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। এখন যদি ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হাত খালি থাকে, তবে প্রশান্ত মহাসাগরে কোনো বিপদ এলে তারা পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে পারবে না। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র মাসে গড়ে মাত্র ৬০টি মিসাইল তৈরি করতে পারে, অথচ যুদ্ধের প্রথম দিনেই তাদের দরকার হয়েছিল ৮০৩টি। এই বিশাল শূন্যস্থান পূরণ না হলে চীন বা রাশিয়ার মতো বড় শক্তির সামনে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপদে পড়তে পারে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও এই পরিস্থিতি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, মার্কিন সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদের লড়াই চালিয়ে যাওয়া এখন ১০০% কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই ঘাটতির কথা সরাসরি স্বীকার করতে নারাজ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বুক ফুলিয়ে দাবি করেছেন, “বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে আমাদের কাছে অনেক বেশি গোলাবারুদ আছে।” কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রাম্প আসলে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে জেতার জন্য এমন কথা বলছেন। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা বর্তমানে মাত্র ২৫% থেকে ৩০% সক্ষমতা নিয়ে চলছে, যা যুদ্ধের বিশাল চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য।

অবশ্য মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও ইরানের অবস্থা আরও শোচনীয়। মার্কিন হামলায় ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্ত্র তৈরির কাঠামো এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের মূল ভিত্তি প্রায় মাটির সাথে মিশে গেছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দাপট এখন দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে। পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, সস্তা ড্রোন দিয়ে দামী ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করানো ছিল ইরানের একটি কৌশল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখন “মেড ইন আমেরিকা” স্লোগান দিয়ে নিজেদের কারখানায় উৎপাদন দ্বিগুণ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত এই অসম দৌড়ে কে জিতবে তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দ্রুত সচল হতে পারে তার ওপর। আপাতত সারা বিশ্বের নজর এখন হোয়াইট হাউসের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ