যশোরের চাঁচড়ায় ট্রাক্টর পার্টস ব্যবসায়ী ও মালিকদের সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যশোরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চাঁচড়া এলাকায় মঙ্গলবার বিকেলে ট্রাক্টর মালিক এবং ট্রাক্টর পার্টস ব্যবসায়ীদের এক বিশেষ সভা সম্পন্ন হয়েছে। স্থানীয় একটি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই সভায় ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা এবং বর্তমান বাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করেন বক্তারা। সভায় সভাপতিত্ব করেন চাঁচড়া এলাকার বিশিষ্ট ট্রাক্টর পার্টস ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান আমান। সভায় উপস্থিত বক্তারা এই খাতের নানা সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।

সভার শুরুতে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে খুচরা যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়। বক্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের ($) দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদেশ থেকে ট্রাক্টরের যন্ত্রাংশ আমদানি করতে আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। গত এক বছরে আমদানিকৃত পার্টসের দাম প্রায় ২০% থেকে ২৫% পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে স্থানীয় বাজারে খুচরা বিক্রেতাদের যেমন বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে, তেমনি সাধারণ ট্রাক্টর মালিকদেরও মেরামত কাজে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে ব্যবসায়ীদের লাভ কমিয়ে হলেও সেবার মান ধরে রাখার আহ্বান জানানো হয়।

সভায় উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শাফিউর রহমান, সাইফুর রহমান, সাইফুল মীর, বাদল শেখ ও জাহাঙ্গীর হোসেন। এছাড়া ট্রাক্টর মহাজনদের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীর হোসেন এবং শাহিন ফরিদসহ আরও অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী সভায় অংশ নেন। তারা বলেন, যশোরের চাঁচড়া বাজার থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই খাতের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৫০০ কোটি টাকার উপরে। সভায় অংশ নেওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, বড় আমদানিকারকদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তাদের অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়।

আলোচনায় উঠে আসে ক্ষতিগ্রস্ত মহাজন এবং মাঠ পর্যায়ের ড্রাইভার ও হেলপারদের সমস্যার কথা। অনেক মালিক অভিযোগ করেন যে, ট্রাক্টরের যান্ত্রিক ত্রুটি সারাতে গিয়ে তাদের পকেটের একটি বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। বর্তমানে একটি নতুন ট্রাক্টরের ইঞ্জিন মেরামত করতে বা টায়ার পরিবর্তন করতে আগের চেয়ে ৩০% বেশি টাকা লাগছে। অনেক মালিক কিস্তিতে ট্রাক্টর কিনে এখন সেই ঋণের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে ১০০% ব্যর্থ হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদহার কমানোর জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানোর কথা বলেন তারা।

ব্যবসায়ী নেতা আমিনুর রহমান আমান তার বক্তব্যে বলেন, আমাদের এই সমিতির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত একে অপরের বিপদে পাশে দাঁড়ানো। বিশেষ করে যেসব ড্রাইভার ও হেলপার দুর্ঘটনায় আহত হন বা অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একটি কল্যাণ তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ না থাকি তবে বড় সিন্ডিকেটগুলো আমাদের ব্যবসা গিলে খাবে। তাই বাজারে যেন পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়, সেদিকেও ব্যবসায়ীদের নজর দিতে হবে। সভায় উপস্থিত সকলে তার এই প্রস্তাবকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানান।

সভায় ড্রাইভার ও হেলপারদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, দক্ষ চালক থাকলে গাড়ির আয়ু বাড়ে এবং যন্ত্রাংশের ক্ষয় অন্তত ১৫% কমানো সম্ভব। বর্তমানে দেশের কৃষি ও নির্মাণ কাজে ট্রাক্টরের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। এই খাতের সাথে জড়িত শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমা সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পায়। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, শ্রমিকরা ভালো থাকলে ব্যবসায় গতি আসবে।

যশোর জেলা ট্রাক্টর পার্টস ব্যবসায়ী সমিতির এই সভাটি ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। ব্যবসায়ীরা একে অপরের সঙ্গে ব্যবসায়িক গোপন টিপস শেয়ার করেন এবং ভবিষ্যতে কীভাবে আমদানি খরচ কমানো যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা করেন। অনেকে বলেন, ভারত থেকে যন্ত্রাংশ সরাসরি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বাধা দূর করা গেলে ক্রেতারা আরও ১০% কম দামে মালামাল কিনতে পারবেন। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, চাঁচড়া বাজারকে একটি আধুনিক অটোমোবাইল হাবে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।

পরিশেষে, সভার সমাপনী বক্তব্যে সভাপতি আমিনুর রহমান আমান উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আজকের এই সভা আমাদের মধ্যে যে সেতুবন্ধন তৈরি করল, তা ভবিষ্যতে ব্যবসায়িক মন্দা কাটাতে সহায়ক হবে। আমরা চাই চাঁচড়ার প্রতিটি ব্যবসায়ী যেন সম্মানজনকভাবে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। সভায় উপস্থিত সকল স্তরের ব্যবসায়ীরা হাত তুলে সমিতির সিদ্ধান্তের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং আগামীতে আরও বড় পরিসরে এই ধরনের সভার আয়োজন করার প্রতিশ্রুতি দেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ