দেশের কৃষিকে এগিয়ে নিতে এবং প্রতিটি ইঞ্চি জমি আবাদযোগ্য করতে বর্তমান সরকার যখন দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি জোরদার করেছে, ঠিক তখন চট্টগ্রামের পটিয়ায় দেখা গেছে সম্পূর্ণ উল্টো এক চিত্র। পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে সরকারি খালের মুখে বাঁধ দিয়ে নিজের যাতায়াতের রাস্তা বানিয়েছেন আশীষ সরকার নামে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। এর ফলে পুরো গ্রাম এখন এক বিশাল জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে গ্রামের শত শত একর আবাদি জমি পানির নিচে তলিয়ে থাকায় চাষিদের কপালে এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ।
আশীষ সরকার হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের রাস মন্দিরের দক্ষিণ পাশে বোয়ালখালী খাল ও ব্রহ্মচারী খালের সংযোগস্থলটি ভরাট করে ফেলেছেন। এই সংযোগস্থলটি দিয়েই পুরো গ্রামের বৃষ্টির পানি কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ত। অভিযোগ উঠেছে, আশীষ সরকার তার প্রায় ১০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা বাগানবাড়ি ও প্লট বিক্রির প্রকল্পের যাতায়াতের সুবিধার জন্য কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা না করেই এই বাঁধ নির্মাণ করেছেন। এর ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ ১০০% বন্ধ হয়ে গেছে। আগে যেখানে কৃষকরা বছরে কয়েকবার ফসল ফলাতেন এবং শাকসবজি চাষ করে স্বাবলম্বী ছিলেন, এখন সেখানে কেবল কচুরিপানা আর পচা পানি ছাড়া আর কিছুই নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যমতে, হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের দত্ত বাড়ি, মজুমদার বাড়ি, মিত্র বাড়ি এবং দেবপাড়ার প্রায় ৫০০টি পরিবার এখন স্থায়ীভাবে পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। একটু বৃষ্টি হলেই এসব এলাকার ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। ফলে ২ হাজারেরও বেশি মানুষ অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে বেঁচে আছেন। কৃষকদের আয় এখন আগের তুলনায় ৮০% থেকে ৯০% কমে গেছে। অনেকেই বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কৃষক বলেন, “আগে আমরা এই জমি থেকে লাখ লাখ টাকার ধান ও সবজি পেতাম, এখন সেখানে শুধুই অথৈ পানি।”
এই বিষয়ে অভিযুক্ত আশীষ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত দাম্ভিকতার সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন, “এই খালের কোনো অস্তিত্ব আরএস বা বিএস খতিয়ানে নেই। আমি জায়গা কিনে প্লট করেছি, সেখানে যাওয়ার জন্য রাস্তার প্রয়োজন ছিল। তৎকালীন চেয়ারম্যানকে জানিয়েই আমি এই কাজ করেছি।” তিনি আরও দাবি করেন যে, মাটির নিচে তিনি একটি ছোট পাইপ দিয়েছেন পানি চলাচলের জন্য। তবে স্থানীয়রা বলছেন, ওই চিকন পাইপ দিয়ে বিশাল গ্রামের পানি বের হওয়া অসম্ভব। আশীষ সরকার সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, “নিউজ করলে করেন, তাতে আমার কিছুই হবে না। আমি প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেব।”
ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার দোলন কান্তি দত্ত বলেন, “এটি শত বছরের পুরনো একটি সরকারি নালা ছিল। আশীষ সরকার প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থেকে এখানে বাঁধ দিয়েছেন, যা সরাসরি জনস্বার্থের পরিপন্থী।” অন্যদিকে বর্তমান মহিলা মেম্বার বেবি চৌধুরী প্রথমে খালের অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে স্বীকার করেন যে সেখানে আগে একটি নালা ছিল। এলাকার জনপ্রতিনিধিদের এমন দ্বিমুখী অবস্থানে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
হাবিলাসদ্বীপের সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছে, এই সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে যেকোনো সময় এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটতে পারে। কারণ সাধারণ মানুষ এখন পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া অবস্থায় আছেন। তাদের দাবি, পটিয়া-১২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এনামুল হক এনাম এবং জেলা প্রশাসক যেন ব্যক্তিগতভাবে এই বিষয়টি খতিয়ে দেখেন। অবৈধ এই বাঁধ অপসারণ করা না হলে হাজার হাজার কৃষকের কপাল পুড়বে এবং এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য ৫০০% ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গ্রামবাসী এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কৃষিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তারা চান যেন তাদের বাপ-দাদার কৃষি জমিগুলো আবারও আবাদের আওতায় আসে এবং তারা জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পান। সরকারি খালের ওপর থেকে প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব হটিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনাই এখন এই দুই হাজার মানুষের একমাত্র প্রাণের দাবি।
















