মানবতার সেবায় সেনাবাহিনী: দীঘিনালায় অর্থের অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হওয়া ব্যক্তির পাশে জোন কমান্ডার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় আবারও মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা আর অভাবের যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া এক ব্যক্তির চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে তাঁর মুখে হাসি ফুটিয়েছে দীঘিনালা জোন। সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে উপজেলার ১ নম্বর মেরুং ইউনিয়নের রশিক নগর আশ্রম এলাকার বাসিন্দা হিরন শেখের হাতে জরুরি চিকিৎসার জন্য নগদ ২০,০০০ টাকা (যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ১৬৭ ডলার) তুলে দেয় সেনাবাহিনী। জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল আমিনের এই বিশেষ উদ্যোগ পুরো এলাকায় ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

হিরন শেখ পেশায় একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তাঁর জীবন থমকে গিয়েছিল পিত্তথলিতে পাথরজনিত অসহ্য যন্ত্রণায়। চিকিৎসকেরা দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিলেও তাঁর আর্থিক অবস্থা ছিল একেবারেই শোচনীয়। নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই পরিবারটির পক্ষে কয়েক হাজার টাকা জোগাড় করাও ছিল আকাশকুসুম কল্পনা। রোগের যন্ত্রণায় যখন হিরন শেখের শরীরের অবস্থা দিন দিন অবনতি হচ্ছিল, তখন পরিবারের কাছে চিকিৎসা করানোর মতো মাত্র ৫% অর্থও সঞ্চিত ছিল না। ঠিক এমন এক সংকটময় মুহূর্তে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সেনাবাহিনী।

দীঘিনালা জোনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, তারা যখন জানতে পারেন যে হিরন শেখ টাকার অভাবে সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না, তখনই বিষয়টি জোন কমান্ডারের নজরে আনা হয়। জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল আমিন কোনো দেরি না করে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর চিকিৎসার জন্য এই আর্থিক অনুদান মঞ্জুর করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক কাজগুলো করা সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। পাহাড়ি জনপদে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় এই ধরণের কার্যক্রম ১০০% কার্যকর ভূমিকা পালন করে বলে মনে করেন এই সামরিক কর্মকর্তা।

টাকা হস্তান্তরের সময় জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় সাধারণ মানুষের সুখে-দুখে পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। পাহাড়ি এলাকার মানুষগুলো অনেক কষ্ট করে জীবনযাপন করেন। বিশেষ করে যারা হতদরিদ্র, তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্বের অংশ। আজ আমরা হিরন শেখকে ২০,০০০ টাকা দিচ্ছি প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য। তবে এখানেই আমাদের দায়িত্ব শেষ নয়। তাঁর যদি আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তবে দীঘিনালা জোন তাঁর পাশে থেকে সব ধরণের সাহায্য করবে। আমাদের লক্ষ্য হলো এই এলাকার মানুষ যেন চিকিৎসার অভাবে অকালে ঝরে না পড়ে।’

সহায়তা পাওয়ার পর হিরন শেখের চোখে ছিল আনন্দাশ্রু। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমি গত কয়েক মাস ধরে ঠিকমতো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতাম না। পেটের যন্ত্রণায় সারারাত জেগে কাটাতাম। অপারেশন করানোর মতো একটা টাকাও আমার কাছে ছিল না। আমি ভাবিনি যে সেনাবাহিনীর বড় সাহেবরা আমার মতো গরিবের খবর নেবেন। আজ এই টাকাগুলো পাওয়ায় আমি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছি। এখন আমি দ্রুত অপারেশন করিয়ে আবারও কাজে ফিরতে পারব। আমার এবং আমার পরিবারের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীর প্রতি রইল শতভাগ কৃতজ্ঞতা।’

স্থানীয় রশিক নগর আশ্রম এলাকার বাসিন্দারাও এই মানবিক উদ্যোগে দারুণ খুশি। তাদের মতে, পাহাড়ে যখনই কোনো বিপদ আসে, তখনই সেনাবাহিনী সবার আগে এগিয়ে আসে। শুধু বড় বড় অভিযান নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যাগুলোতেও তাদের এই অংশগ্রহণ সাধারণ মানুষের মনে আস্থা ও ভালোবাসার জায়গা তৈরি করেছে। গত কয়েক বছরে দীঘিনালায় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এরকম অসংখ্য মানুষকে বিনামূল্যে ওষুধ, খাবার এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই ধরণের সাহায্য পাওয়ায় এলাকায় অপরাধের প্রবণতাও অন্তত ৪০% কমে এসেছে।

দীঘিনালা জোন সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে যে, শুধু চিকিৎসা নয়, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও তারা স্থানীয়দের সহায়তা করে যাচ্ছে। মেরুং ইউনিয়নের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় যেখানে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো বেশ কঠিন, সেখানে সেনাবাহিনীর এই সহায়তাগুলো স্থানীয়দের জন্য বড় আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ২০,০০০ টাকা কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি হিরন শেখের পরিবারের কাছে নতুন জীবনের প্রতীক। সেনাবাহিনী চায় পাহাড়ি অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ যেন সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

আজকের এই সহায়তা প্রদানের ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, সেনাবাহিনী কেবল সীমান্তের প্রহরী নয়, তারা সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। হিরন শেখের পিত্তথলির পাথর অপসারণের জন্য এখন দ্রুতই সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দীঘিনালা জোন ভবিষ্যতেও খাগড়াছড়ির অসহায় মানুষের সেবায় এভাবে ২০০০% নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই ছোট একটি উদ্যোগই পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ে সেনাবাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধার জায়গাটি আরও মজবুত করল।

সম্পর্কিত নিবন্ধ