বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা প্রত্যক্ষ করল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গণহত্যার দায় চাপানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং তার পূর্বসূরি মো. আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। রবিবার পৃথক দুটি সংগঠনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগগুলো দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যতগুলো গুম, খুন এবং গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার দায় এই দুই সাবেক রাষ্ট্রপতি এড়াতে পারেন না। তারা কেবল চুপ থাকেননি, বরং খুনি সরকারকে সব ধরনের আইনি ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রবিবার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা দেয় ‘বাংলাদেশ আজাদি পার্টি’ এবং ‘রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম’ নামের দুটি সংগঠন। আজাদি পার্টির পক্ষ থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. হাসিনুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে যত বড় বড় হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা ঘটেছে, তার কোনোটিরই প্রতিবাদ সাবেক এই দুই রাষ্ট্রপতি করেননি। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের অভিভাবক হয়েও জনগণের ওপর হওয়া অন্যায়ে তাদের প্রায় ১০০% (১০০ শতাংশ) মৌন সম্মতি ছিল। বিশেষ করে আয়নাঘরের মতো জায়গায় মানুষকে বছরের পর বছর আটকে রাখা এবং জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলি চালিয়ে কয়েক শ মানুষকে হত্যার ঘটনায় তাদের পরোক্ষ মদত ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আজাদি পার্টির প্রধান সংগঠক মুন্সি বোরহান মাহমুদ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তার বক্তব্যে সাবেক দুই রাষ্ট্রপতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বিডিআর বিদ্রোহ বা পিলখানা হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে শাপলা চত্বরের নারকীয় ঘটনা—সব সময় আবদুল হামিদ বা মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন। তারা চাইলে এই গণহত্যাগুলো আটকাতে পারতেন বা পদত্যাগ করে প্রতিবাদের উদাহরণ তৈরি করতে পারতেন। কিন্তু তারা ফ্যাসিস্ট সরকারকে বৈধতা দিয়েছেন এবং ক্ষমতার অংশ হয়ে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। অভিযোগকারীরা মনে করেন, এই দুই ব্যক্তির সহযোগিতা ছাড়া শেখ হাসিনার সরকার এত বড় অপরাধ করার সাহস পেত না। তাই এই অন্যায়ের বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে হওয়া এখন সময়ের দাবি।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের অভিযোগটি মূলত সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে কেন্দ্র করে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াস নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে অভিযোগে বলেন, গত বছরের ১৮ জানুয়ারি রাতে তাকে রাজধানীর মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে গুম করা হয়েছিল। তার অপরাধ ছিল তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে শাহবাগে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। পরদিন তাকে বাংলামোটর এলাকায় ফেলে যাওয়া হয়। আল নূর মোহাম্মদের দাবি, তার এই অপহরণের পেছনে সাহাবুদ্দিনের সরাসরি হাত ছিল। তিনি অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতিকে শেখ হাসিনার ‘একান্ত সহযোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের পেছনে তার হুকুম ছিল কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচন থেকে শুরু করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ধাপে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। জুলাই মাসের গণ-আন্দোলনের সময় যখন কয়েক শ ছাত্রকে গুলি করে মারা হচ্ছিল, তখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। আন্দোলনকারীদের দমনে যে অমানবিক নির্যাতন ও খুনের উৎসব চলেছিল, তাতে রাষ্ট্রপতির নীরবতাকে ‘আইনগত অপরাধ’ হিসেবে দেখছে রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম। তারা ট্রাইব্যুনালের কাছে দাবি জানিয়েছেন, একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির আইনগত দায় নির্ধারণ করা হোক। প্রায় ৯০% (৯০ শতাংশ) ভুক্তভোগী পরিবারও এখন এই উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বিচারের দাবি তুলছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এসব অভিযোগ গ্রহণ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি নিয়ে আইনি পর্যালোচনা চলছে এবং সময়মতো বিস্তারিত জানানো হবে। তবে আইনমন্ত্রী আসিফ নজরুল এর আগেই গণমাধ্যমকে বলেছিলেন যে, সাবেক রাষ্ট্রপতির বিষয়ে সরকার সঠিক সময়ে এবং সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেবে। ট্রাইব্যুনাল সূত্র বলছে, বর্তমানে জুলাই হত্যাকাণ্ডের অনেকগুলো অভিযোগের তদন্ত চলছে, যার সাথে এই দুই সাবেক রাষ্ট্রপতির সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাষ্ট্রপতির মতো অলংকৃত পদে থেকে যদি কেউ অপরাধে সহায়তা করেন, তবে তার বিচার হওয়াটা আইনের শাসনের জন্য জরুরি। সাধারণত বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদের এক ধরনের দায়মুক্তি থাকে, তবে গণহত্যা বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ভিন্ন কথা বলে। অভিযোগকারীদের যুক্তি হলো, যদি শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিচার হতে পারে, তবে তাদের রক্ষাকারী রাষ্ট্রপ্রধানদেরও বিচার হতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই দাবি জোরালো হচ্ছে যে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এই বিচারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোনো রাষ্ট্রপতি যেন ফ্যাসিস্ট সরকারের দালালি না করেন, সেই বার্তাই দিতে চাইছেন অভিযোগকারীরা।
সার্বিকভাবে, ট্রাইব্যুনালে সাবেক দুই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মোড়। এটি কেবল দুই ব্যক্তির বিচারের বিষয় নয়, বরং দীর্ঘ ১৫ বছরের ক্ষমতার কাঠামোর মূল উৎপাটনের চেষ্টা। যদি এই অভিযোগগুলো তদন্তে প্রমাণিত হয়, তবে তা বিশ্ব রাজনীতিতেও একটি বড় নজির হয়ে থাকবে। এখন সবার নজর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দিকে—তারা কীভাবে এই স্পর্শকাতর অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মনে করে, যদি শীর্ষ পর্যায় থেকে বিচার শুরু হয়, তবেই দেশের মানুষ প্রকৃত ন্যায়বিচার পাবে এবং ভবিষ্যতে কোনো শাসক সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানোর সাহস পাবে না।
















