দিল্লিতে ছাত্র বিদ্রোহের আগুন: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিচারে অনড় ছাত্রসমাজ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে চলমান ছাত্র আন্দোলন এখন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত ১০ বছরের মধ্যে এমন গণবিক্ষোভ ভারত খুব একটা দেখেনি। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজপথ থেকে শুরু করে সংসদ ভবন। গত বুধবার টানা ৩ দিনের মতো অচল হয়ে পড়ে লোকসভা ও রাজ্যসভার অধিবেশন। বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, গত ১ দশকে অন্তত ১৫৪টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, অথচ ১০০% ভাগ ক্ষেত্রে মূল অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। একজন অপরাধীরও সাজা না হওয়াকে তিনি ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় লজ্জা হিসেবে দেখছেন।

এদিকে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি এখন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। গত মঙ্গলবার ও বুধবার তুমুল বৃষ্টির মধ্যেও হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী রাজপথে রাত কাটিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং সেখানে খাবার ও পানীয় জল ঢুকতে বাধা দেয়। কিন্তু এই অমানবিক আচরণের পরও শিক্ষার্থীদের দমানো যায়নি। বরং দিল্লির সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সুইগি, জোম্যাটো ও ফুড পান্ডার মতো খাবার ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ আন্দোলনস্থলে বিরিয়ানি, চা ও শুকনো খাবার পাঠিয়েছেন। এমনকি পরিস্থিতি এমন হয় যে, খাবার বেশি হয়ে যাওয়ায় ছাত্রনেতাদের সামাজিক মাধ্যমে আবেদন করতে হয়েছে যাতে নতুন করে আর খাবার না পাঠানো হয়।

এই আন্দোলনকে অনেকেই এখন প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার যুব বিদ্রোহের সাথে তুলনা করছেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সংগঠন সিজেপি (ককরোচ জনতা পার্টি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা যন্তর মন্তর ছাড়বেন না। সরকার পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং আলোচনার প্রস্তাব দিলেও ছাত্ররা তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা সাফ জানিয়েছেন, মন্ত্রীদের ড্রয়িংরুমে গিয়ে কোনো চা-চক্র হবে না। যদি সরকার সত্যিই আন্তরিক হয়, তবে মন্ত্রীদের যন্তর মন্তরে এসে ছাত্রদের সামনে সরাসরি কথা বলতে হবে। এক ছাত্রনেতা গণমাধ্যমকে বলেন, “গত ২০ জুলাই যা দেখেছেন তা ছিল স্রেফ ট্রেলার, আসল সিনেমা এখনো বাকি আছে। সরকার যদি দাবি না মানে, তবে লাখ লাখ ছাত্র দিল্লি অচল করে দেবে।”

সংসদের ভেতরেও ছবিটা ছিল দেখার মতো। রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্য গতকাল কালো পোশাক পরে সংসদে আসেন। তাঁদের দাবি একটাই অযোগ্য শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে এই ঘটনার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। তবে বিজেপি নেতারা এই পুরো আন্দোলনের পেছনে ‘বিদেশি চক্রান্ত’ খুঁজে পাচ্ছেন। রাজনাথ সিংয়ের মতো জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা অভিযোগ করছেন যে, পাকিস্তান, খালিস্তান কিংবা মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরসরা ভারতের স্থিতিশীল সরকারকে অচল করতে এই ছাত্রদের ব্যবহার করছে। বিজেপি দাবি করছে, নরেন্দ্র মোদির ইমেজ নষ্ট করতেই বিরোধী দলগুলো ছাত্রদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে।

আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে দিল্লির গণপরিবহনেও। ছাত্রদের মিছিল ঠেকাতে এবং সাধারণ মানুষকে আন্দোলনস্থল থেকে দূরে রাখতে দিল্লি মেট্রো কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৬টি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। এতে করে প্রতিদিনের অফিসযাত্রী ও সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক স্টেশনের ভেতরেই যাত্রীরা পুলিশের সাথে তর্কে লিপ্ত হন এবং সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। অন্যদিকে, গুজরাটসহ দেশের অন্যান্য রাজ্যেও এই আন্দোলনের ছোঁয়া লেগেছে। আহমেদাবাদে বিক্ষোভ চলাকালীন দ্য হিন্দুর রিপোর্ট অনুযায়ী অন্তত ১০০ জন ছাত্রকে আটক করা হয়েছে। বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কেও বড় ধরনের সমাবেশ করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।

দিল্লি হাইকোর্টও এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ ও নির্যাতনের অভিযোগ শুনে আদালত পুলিশকে কড়া ভর্ৎসনা করেছে। বিচারপতিরা নির্দেশ দিয়েছেন যে, সিসিটিভি ফুটেজ বা কোনো প্রমাণ যেন কোনোভাবেই নষ্ট না করা হয়। আদালত স্পষ্ট করে বলেছে, শিক্ষার্থীদের ওপর এই পুলিশি অত্যাচার গোটা দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি পুলিশ যখন এই ঘটনাকে ‘অপপ্রচার’ বলে চালানোর চেষ্টা করে, আদালত তা সরাসরি নাকচ করে দেয়। অন্যদিকে, লদাখের পরিবেশবাদী কর্মী সোনম ওয়াংচুকও এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে অনশন করছিলেন। ছাত্রনেতারা গতকাল তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারি এখন মোদি সরকারের জন্য বড় এক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১০ বছরের শাসনকালে এটি অন্যতম বড় একটি ছাত্রবিক্ষোভ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ছাত্রসমাজ যেভাবে সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন পাচ্ছে, তাতে করে সরকার খুব বেশি সময় আলোচনায় না বসে থাকতে পারবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যন্তর মন্তরের এই আগুন কবে নিভবে, তা এখন নির্ভর করছে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রকৃত বিচার হওয়ার ওপর। শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁদের সাথে হওয়া অন্যায়ের ১০০% প্রতিকার না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা ঘরে ফিরবেন না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ