মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তাপ: সৌদির বিরুদ্ধে হুতিদের নৌ অবরোধ, বিশ্ব বাজারে জ্বালানি সংকটের তীব্র শঙ্কা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মধ্যপ্রাচ্যে আবার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা যখন চরমে, ঠিক তখনই ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি এক চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দিয়েছে। তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সরাসরি নৌ অবরোধের ডাক দিয়েছে। সোমবার ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, এখন থেকে তারা সমুদ্রপথে সৌদি আরবের বাণিজ্য ও নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেবে। হুতিদের এই পদক্ষেপের ফলে পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ভয়াবহ অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সারা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশ্ব বাণিজ্যেও এক বিশাল ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

হুতিদের সশস্ত্র বাহিনী একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে বলেছে যে, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের ওপর ‘অন্যায্য এবং নিপীড়নমূলক অবরোধ’ চালিয়ে আসছে। এখন তারা ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতি গ্রহণ করেছে। এই নীতির অধীনেই তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে সমুদ্রপথে অবরোধ কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে। হুতিদের এই চরম হুঁশিয়ারির পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। তবে এই ঘোষণার পর সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পাল্টা প্রতিক্রিয়া বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রিয়াদ সম্ভবত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবে।

গত ৯ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে অত্যন্ত উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গতকাল রোববার দিবাগত রাতেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এটি ছিল টানা নবম রাতের মতো হামলা। এর জবাবে তেহরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি; তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, মাত্র এক মাস আগেই দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, যা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে বললেই চলে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা এখন ১০০% সত্য বলে মনে হচ্ছে।

হুতিদের এই অবরোধের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সোমবারের এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছু সময়ের জন্য বেশ বেড়ে গিয়েছিল। তবে বিনিয়োগকারীরা যখন দেখলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রেখেছে, তখন দাম আবার কিছুটা কমে আসে। তবুও তেলের বাজারে অস্থিরতা কাটছে না। যদি সত্যিই হুতিরা সফলভাবে এই অবরোধ কার্যকর করতে পারে, তবে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অনেক অর্থনীতিবিদ আশঙ্কা করছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর, যারা আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

ইরান চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখতে। এজন্য তেহরান হুতিদের ওপর চাপ দিচ্ছে যাতে তারা আরব সাগর থেকে লোহিত সাগরে প্রবেশের প্রধান পথ ‘বাব-এল-মান্দেব প্রণালি’ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এই প্রণালিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। যদি এই পথটি বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ অন্তত ৭% কমে যাবে। বর্তমান উপসাগরীয় যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যেই বিশ্বের তেল সরবরাহ প্রায় ১০% কমে গেছে। নতুন করে সরবরাহ কমে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। হুতিদের হাতে থাকা আধুনিক ড্রোন এবং মিসাইল প্রযুক্তি এই নৌপথটিকে যেকোনো সময় বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।

একদিকে যেমন বোমা পড়ছে, অন্যদিকে চলছে আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধান করতে চায়। কিন্তু হুতিদের মতো তৃতীয় একটি পক্ষের যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া আলোচনার পরিবেশকে জটিল করে তুলছে। ইরান হয়তো হুতিদের একটি ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের দরকষাকষি করা যায়। আবার ওয়াশিংটনও চাইছে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে তেহরানকে দুর্বল করতে। এই দ্বিমুখী লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে সৌদি আরব এখন সবথেকে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ হুতিদের ড্রোন হামলা আগেও সৌদির তেল স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষতি করেছিল।

সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। বিমা কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ওপর প্রিমিয়াম বাড়াতে শুরু করেছে। অনেক জাহাজ এখন বিকল্প এবং দীর্ঘ পথ ব্যবহার করছে, যার ফলে পরিবহন খরচ প্রায় ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। হুতিরা যদি সত্যি সত্যি সৌদি আরবের জাহাজগুলো লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে, তবে লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরের বাণিজ্যপথগুলো সাধারণ জাহাজ চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। এতে শুধু তেল নয়, খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য জরুরি পণ্যের সরবরাহও চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। হুতিদের এই নৌ অবরোধের ঘোষণা পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। যদি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত কোনো স্থায়ী সমাধানে না পৌঁছাতে পারে, তবে এই অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। আর সেই যুদ্ধের উত্তাপ পুরো বিশ্বকে সইতে হবে। আগামী কয়েক দিন এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্বের নজর এখন রিয়াদ, তেহরান এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ