মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ যুদ্ধের কালো মেঘ: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত অর্ধশত, যেকোনো সময় শুরু হতে পারে ‘সর্বাত্মক অভিযান’

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মধ্যপ্রাচ্য এখন যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি, যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়ে পুরো বিশ্বে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে পারে। গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে পরিমাণ পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে, তাতে নতুন করে বড় আকারের যুদ্ধের আশঙ্কা প্রায় ১০০% বেড়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ওয়াশিংটন আর মেনে চলবে না। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানও পাল্টা অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে। তেহরান হুশিয়ারি দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এভাবে আরও ২ থেকে ৩ দিন হামলা চালিয়ে যায়, তবে তারা ‘সর্বাত্মক অভিযান’ শুরু করবে। অর্থাৎ, পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখান থেকে ফিরে আসার পথ ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

গত সাত দিন ধরে মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর টানা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, শুক্রবার দিবাগত রাতে তারা ইরানের সামরিক রসদ সরবরাহ কেন্দ্র, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডার এবং নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছে। তবে ইরান বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এখন শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং সাধারণ মানুষের ব্যবহারের সেতু, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক অবকাঠামোকেও ধ্বংস করছে। ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে গত ১০ দিনে ১২টি শহরের ৯৫টি স্থানে হামলা হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ অঞ্চলের গ্রামগুলোতে সুপেয় পানির সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে গেছে। কারণ, হামলার কারণে পানি শোধনাগারের পাম্পগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে, যার মেরামত করতে প্রায় কয়েক কোটি $ (ডলার) খরচ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই অসম যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও বেশ ভয়াবহ। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং ৫০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। শুধু ইরানের দক্ষিণাঞ্চলেই ১১৬টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে ওই এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ১০০% বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও বসে নেই। তারা পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। বিশেষ করে কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে মার্কিন সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।

জর্ডানে গত শুক্রবার ইরানের হামলায় ২ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও ১ জন সৈন্য নিখোঁজ রয়েছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এ পর্যন্ত মোট ১৬ জন মার্কিন সৈন্য প্রাণ হারিয়েছেন। ইরান শুধু সামরিক ঘাঁটিতেই হামলা করেনি, বরং কুয়েতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রেও আঘাত হেনেছে। কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার ফলে তাদের কয়েকটি ইউনিটের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কুয়েতের বড় একটি অংশে এখন লোডশেডিং চলছে। অন্যদিকে, বাহরাইনের মার্কিন বিমানঘাঁটি ও জ্বালানি সংরক্ষণাগারেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় ৩ মাস পর প্রথমবারের মতো সৌদি আরবেও হামলা চালিয়েছে ইরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে রিয়াদের কাছে আল-খারজ এলাকায় অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। যদিও সৌদি আরব বা ইরান এই বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি, তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, যুদ্ধ এখন আর শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। সিরিয়াতেও প্রথমবারের মতো হামলার খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক লিখিত বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিলেন, তার কোনো মূল্য নেই। যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ প্রমাণ করেছে যে তাদের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি মিথ্যা। অন্যদিকে ইরানের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হামলা বন্ধ না করে, তবে ইরান তাদের হাতে থাকা দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সরাসরি মার্কিন মূল ভূখণ্ড বা তাদের মিত্রদের ওপর ‘সর্বাত্মক অভিযান’ শুরু করবে। এই হুশিয়ারি বিশ্ববাজারে তেলের দামকেও প্রভাবিত করতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার শক্তিশালী কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। কাতার ও পাকিস্তান মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও দুই দেশের জেদি মনোভাবের কারণে তা সফল হচ্ছে না। কাতারভিত্তিক আরব পারস্পেকটিভস ইনস্টিটিউটের পরিচালক জেইদন আলকিনানি বলেন, যুদ্ধের এই মোড় খুবই বিপজ্জনক। আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে যেভাবে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হচ্ছে, তা মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, কারণ তারা জানে না কখন কার ওপর আকাশ থেকে বোমা এসে পড়বে।

পরিশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই ইঁদুর-বিড়াল খেলা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। যদি এখনই কোনো কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে এই অঞ্চলটি দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসের মুখে পড়বে। দুই দেশের নেতারাই এখন তলোয়ারে শান দিচ্ছেন এবং একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিচ্ছেন। সাধারণ মানুষ কেবল তাকিয়ে দেখছে কীভাবে বিশ্বশান্তি ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। আগামী ২-৩ দিন পুরো বিশ্বের জন্য অত্যন্ত সংকটময় সময় হতে যাচ্ছে, কারণ এই সময়ের মধ্যেই নির্ধারিত হবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ।

সম্পর্কিত নিবন্ধ