সংসারের মঙ্গল কামনায় কলকাতায় বিপত্তারিণী ব্রত: তীব্র গরম উপেক্ষা করে মন্দিরে মন্দিরে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সমরেশ রায় ও শম্পা দাস, কলকাতা:

আজ ১৮ই জুলাই, শনিবার। ভোর হওয়ার আগেই কলকাতার আকাশ যখন ফিকে অন্ধকারে ঢাকা, ঠিক তখন থেকেই শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে অলিগলি। আজ হিন্দুদের পরম শ্রদ্ধার ‘বিপত্তারিণী ব্রত’। বিশেষ করে বাঙালি হিন্দু নারীদের কাছে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতি বছর আষাঢ় মাসে রথযাত্রা থেকে পুনরথযাত্রার মধ্যবর্তী মঙ্গল বা শনিবার এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পঞ্জিকা মতে আজ শনিবার হওয়ায় ভোর থেকেই কলকাতার বিখ্যাত কালীঘাট মন্দির, দক্ষিণেশ্বর ও আদ্যাপীঠসহ পাড়ার ছোট-বড় সব মন্দিরে ছিল ভক্তদের ঢল। সংসারের বড় কোনো বিপদ থেকে মুক্তি পেতে কিংবা ছেলে-মেয়ের দীর্ঘায়ু কামনায় মায়েরা আজ উপবাস থেকে মায়ের চরণে অর্ঘ্য নিবেদন করছেন। তপ্ত রোদ আর ভ্যাপসা গরমকে জয় করে ভোরের আলো ফোটার আগেই মন্দিরের লাইন ছাড়িয়ে গেছে কয়েক কিলোমিটার।

সকাল ৮টার দিকে কালীঘাট মন্দিরে গিয়ে দেখা যায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। প্রচণ্ড দাবদাহ আর আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তিতে নাজেহাল সাধারণ মানুষ, অথচ মায়ের দর্শনে ভক্তদের ধৈর্য ছিল দেখার মতো। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে, আজ কলকাতার তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিন্তু আর্দ্রতার কারণে তা অনুভব হচ্ছিল ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। এত গরমের মধ্যেও প্রায় ১০০% ভক্তি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃদ্ধা থেকে শুরু করে বাড়ির নতুন বউরা। মন্দির কর্তৃপক্ষের মতে, সাধারণ শনিবারের তুলনায় আজ ভিড় প্রায় ৫০% থেকে ৬০% বেশি। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভক্ত বলেন, “মা বিপত্তারিণী সব বিপদ থেকে রক্ষা করবেন, এই বিশ্বাসে গত ৫ ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। গরম একটু কষ্ট দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মায়ের দেখা পেলে সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে।”

বিপত্তারিণী পূজার প্রধান আকর্ষণ হলো ‘তেরো’ সংখ্যাটির মাহাত্ম্য। এই ব্রত পালনের জন্য ভক্তরা ডালিতে তেরো রকমের ফুল ও তেরো রকমের ফল সাজিয়ে আনেন। ফলের তালিকায় আম, জাম, কাঁঠাল থেকে শুরু করে অন্তত ১৩টি ভিন্ন স্বাদের ফল থাকা বাধ্যতামূলক। এর সাথে থাকে তেরোটি গিঁট দেওয়া লাল রঙের পবিত্র সুতো বা ‘ডুরি’। পূজার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ফলের বাজারে রীতিমতো আগুন লেগেছে। সাধারণ সময়ের তুলনায় ফলের দাম আজ প্রায় ৪০% থেকে ৫০% বেশি। এক কেজি আপেল বা আঙুর কিনতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে গুনতে হচ্ছে চড়া দাম। বিক্রেতারা জানান, এক একটি ডালি সাজাতে আনুমানিক ২০০ থেকে ৫০০ টাকা (ভারতীয় মুদ্রা অনুযায়ী) খরচ হচ্ছে। তবে ভক্তির কাছে বাজারের এই উর্ধ্বগতি যেন হার মেনেছে।

শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, আজ যারা ব্রত পালন করছেন, তারা সারাদিন অন্ন গ্রহণ করবেন না। পূজার পর তেরোটি লুচি ও তেরো রকমের ফল দিয়ে উপবাস ভাঙার রীতি রয়েছে। পূজার মণ্ডপগুলোতে দেখা গেল ব্রাহ্মণের মন্ত্রোচ্চারণের সাথে সাথে শত শত ভক্ত একযোগে পুষ্পাঞ্জলি দিচ্ছেন। মন্ত্রের প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে ছিল পরিবারের সুখ-শান্তির আকুতি। পুষ্পাঞ্জলি শেষে সেই তেরো গিঁটের ডুরি হাতে বাঁধার ধুম পড়ে যায়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই ডুরি হাতে থাকলে সারা বছর মা বিপত্তারিণী সেই ব্যক্তিকে যেকোনো প্রাকৃতিক বা জাগতিক বিপদ থেকে ঢাল হয়ে রক্ষা করবেন। বিশেষ করে মায়েরা তাদের সন্তানদের হাতে এই সুতো পরিয়ে দিতে বেশি আগ্রহী থাকেন।

কলকাতার পাশাপাশি দক্ষিণেশ্বর মন্দিরেও আজ ছিল তিল ধারণের জায়গা নেই। গঙ্গার ঘাটে পবিত্র স্নান সেরে হাজার হাজার নারী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছেন মন্দিরে প্রবেশের জন্য। মন্দিরের সেবাইতরা জানান, ভক্তদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এবং অতিরিক্ত ভিড় সামলাতে আজ পুলিশের সংখ্যা প্রায় ৩০% বাড়ানো হয়েছে। বড় বড় মন্দিরের বাইরে স্বেচ্ছাসেবক দল বিনামূল্যে জল ও ওআরএস (ORS) বিতরণ করছিল, যাতে গরমে কেউ অসুস্থ হয়ে না পড়েন। তবুও দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকার ফলে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ কিছুটা অসুস্থবোধ করায় তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ ছিল তুঙ্গে, যেখানে ভক্তি আর লড়াই মিশে গিয়েছিল একাকার হয়ে।

সংসারের মঙ্গল কামনায় বাঙালি নারী যেভাবে নিজেদের উৎসর্গ করেন, তার এক অনন্য নজির দেখা গেল আজকের এই ব্রতে। আধুনিক যুগের ব্যস্ততার মাঝেও চিরাচরিত রীতিনীতি যে আজও ১০০% সজীব, তা মন্দির প্রাঙ্গণে তাকালেই বোঝা যায়। বাড়ির গিন্নিরা ভোরে উঠে ঘরদোর পরিষ্কার করে শুদ্ধবস্ত্রে মন্দিরে চলে গেছেন, ফিরে গিয়ে আবার মেতে উঠেছেন নিরামিষ রান্নায়। কারণ আজকের দিনে নিরামিষ আহার করা ব্রতের অন্যতম অংশ। পরিবারের প্রধান কর্তা থেকে শুরু করে কনিষ্ঠ সদস্য সবার হাতেই আজ দেখা যাবে সেই লাল সুতোর বন্ধন। এই বন্ধন কেবল সুতোর নয়, এটি হলো ভরসা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।

দুপুরের পর মন্দিরের ভিড় কিছুটা কমলেও বিকেলে আবার উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। যারা কর্মব্যস্ততার কারণে সকালে আসতে পারেননি, তারা বিকেলের দিকে মন্দিরে আসছেন প্রণাম জানাতে। পুরো দিনটি যেন এক আধ্যাত্মিক আবহে ডুবে ছিল তিলোত্তমা কলকাতা। রিপোর্টার সমরেশ রায় ও শম্পা দাসের পাঠানো তথ্যমতে, এই বছর বিপত্তারিণী ব্রতে নারী ভক্তদের অংশগ্রহণ বিগত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক অস্থিরতা আর দৈনন্দিন জীবনের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ আরও বেশি করে আধ্যাত্মিকতার আশ্রয় নিচ্ছেন বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। দিন শেষে ক্লান্তি থাকলেও ব্রতীদের চোখে-মুখে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যা কেবল বিশ্বাসের জোরেই সম্ভব।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলার এই ব্রত ও পার্বণগুলো কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এগুলো আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রচণ্ড গরমের মাঝেও তেরোটি ফল আর তেরো গিঁটের ডুরি নিয়ে ভক্তদের এই আরধ্য সাধনা প্রমাণ করে যে, বিপদের দিনে মায়ের প্রতি ভরসাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। বিপত্তারিণী মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরছেন সকলে, এই আশায় যে আগামী দিনগুলো কাটবে নিরাপদ ও শান্তিতে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ