ষড়যন্ত্রের জালে যশোর জিলা স্কুলের ৪ ছাত্র: পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য আর রহস্যময় মামলায় ধ্বংসের পথে মেধাবীদের ভবিষ্যৎ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মালিকুজ্জামান কাকা, যশোর:

যশোরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ যশোর জিলা স্কুল। এই স্কুলের সুনাম সারা দেশজুড়ে। কিন্তু সম্প্রতি এক রহস্যময় ও ষড়যন্ত্রমূলক চুরি মামলায় জড়িয়ে পড়েছে এই স্কুলের দশম শ্রেণীর চার মেধাবী ছাত্র। ১৭ লাখ টাকার গহনা ও নগদ ২১ হাজার টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে তাদের শিক্ষাজীবন চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক সুগভীর চক্রান্তের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা ও মামলার বাদীর যোগসাজশে সাজানো এই মামলায় দুই ছাত্রকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে চলমান দশম শ্রেণীর টেস্ট পরীক্ষায় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রসহ দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি তারা। মেধাবী এই ছাত্রদের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে, যা নিয়ে পুরো যশোর শহরে তোলপাড় ও তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জুলাই যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয় (মামলা নম্বর ০৬, জি আর ৫৫৫/২৬)। মামলার বাদী মোঃ সাইদুজ্জামান, যিনি রেলওয়ে যশোরের স্টেশন মাস্টার হিসেবে কর্মরত। তিনি শহরের শঙ্করপুর চোপদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা। বিস্ময়কর বিষয় হলো, মামলার অভিযোগে ঘটনার তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে গত ২৫ মার্চ। অর্থাৎ ঘটনার প্রায় ১০০ দিন পর এই মামলা করা হয়েছে। আরও রহস্যের জন্ম দিয়েছে যে, চুরির মূল ঘটনা যেখানে বাদীর নিজের বাড়িতে এবং অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে তার নিজের ছেলে ইরফান জামান রোহান ও তার বন্ধুরা, সেখানে রোহানকে আসামী বা সাক্ষী—কোনোটিই করা হয়নি। ১৭ লাখ টাকার গহনা চুরির দাবি করা হলেও গহনা কেনার কোনো রসিদ বা প্রমাণ পুলিশকে দেখাতে পারেননি বাদী।

অভিযুক্ত চার ছাত্র হলো ষষ্ঠীতলা পিটিআই রোডের রফিক মৌরির ছেলে ইমরান (১ নম্বর আসামী), পুলেরহাট এলাকার মাকসুদূর রহমানের ছেলে পিয়াস (২ নম্বর আসামী), বাহাদুরপুরের আজিজুলের ছেলে আদিত্য (৩ নম্বর আসামী) এবং ধর্মতলার মিন্টুর ছেলে হাবিবুর রহমান (৪ নম্বর আসামী)। এদের মধ্যে ইমরান ও হাবিবুর রহমানকে পুলিশ তড়িঘড়ি করে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মোঃ আনিছুর রহমান খান আসামীদের পরিবারগুলোর কাছ থেকে বিপুল অংকের ঘুষ দাবি করেছেন। তিনি এক অভিভাবকের কাছে সরাসরি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। আরেক শিক্ষার্থীর পরিবারের কাছ থেকে ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইতিমধ্যে ২৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু টাকা নিয়েও তিনি ছাত্রদের স্কুল কর্তৃপক্ষকে কিছু না জানিয়েই আদালতে চালান করে দেন।

গ্রেফতার হওয়া ছাত্রদের অভিভাবকরা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, তাদের ছেলেরা জিলা স্কুলের নিয়মিত ও মেধাবী ছাত্র। সামনে এসএসসি পরীক্ষা, অথচ এই বয়সে তাদের চোর সাজিয়ে জেলে পাঠানো হলো। তদন্তকারী কর্মকর্তা আনিছুর রহমান ছাত্রদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আসার সময় বলেছিলেন, ‘থানায় আসেন, কথা বলে ছেড়ে দেব যাতে ওরা পরীক্ষা দিতে পারে।’ কিন্তু থানায় নেওয়ার পর তিনি টাকার জন্য দর কষাকষি শুরু করেন। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় বা দাবিকৃত পুরো টাকা না পাওয়ায় তিনি দ্রুত আসামীদের আদালতে পাঠিয়ে দেন। এর ফলে আসামীরা তাদের শিক্ষাজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার ছেলের পরীক্ষা চলছিল, পুলিশ তাকে আসামী করে জেলে পাঠালো। অথচ যার বাড়িতে চুরি হলো, তার ছেলে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

মামলার বিবরণে দেখা যায়, চুরির বিষয়টি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও সাজানো বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। কারণ ১৭ লাখ টাকার সোনা চুরি হওয়ার পর কোনো রসিদ না থাকা এবং বাদীর নিজের ছেলেকে মামলা থেকে আড়ালে রাখা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, এটি বন্ধুদের মধ্যে কোনো বিরোধ বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। এই মামলার সাক্ষী করা হয়েছে তাসবীর আহমেদ ও মুজাহিদ নামের দুই ব্যক্তিকে, যাদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। অভিভাবকরা দাবি করেছেন, তদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি করে মামলা রেকর্ড করা এবং পুলিশ ও বাদীর গোপন আঁতাত প্রমাণ করে যে, এই ছাত্রদের ওপর অন্যায় করা হচ্ছে। পুলিশের এই আচরণে অন্তত ৯০% অভিভাবক এখন তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আনিছুর রহমান খানের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ এবং হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে থানায় পাওয়া যায়নি। কতোয়ালি থানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি বিশেষ কাজে থানার বাইরে আছেন। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবির বিষয়টি এখন টক অফ দ্য টাউন। একজন পুলিশ কর্মকর্তার এমন অপেশাদার আচরণে খোদ পুলিশ বাহিনীর মধ্যেই কানাঘুষা চলছে। এদিকে যশোর জিলা স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় তা সম্ভব হয়নি। তবে স্কুলের সাধারণ ছাত্র ও শিক্ষকরা এই ঘটনায় স্তম্ভিত। তারা চান, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন হোক এবং নির্দোষ শিক্ষার্থীরা যেন পরীক্ষায় ফেরার সুযোগ পায়।

যশোরের বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরাও এই মামলাটিকে ‘প্রশ্নবোধক’ ও ‘ষড়যন্ত্রমূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তারা বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধির নিয়ম মেনে তদন্ত না করেই ছাত্রদের জীবন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যেখানে মূল অভিযুক্ত হতে পারতো বাদীর ছেলে, তাকে বাইরে রেখে বন্ধুদের আসামী করা আইনের দৃষ্টিতে রহস্যজনক। ১৭ জুলাই বিষয়টি জনসমক্ষে আসার পর থেকে যশোর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বাড়ছে। অনেকেই বলছেন, চুরির মামলাটি মূলত একটি চাপ সৃষ্টি করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে যাতে বাদীর ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ হাসিল হয়।

মেধাবী এই চার ছাত্রের শিক্ষাজীবন কি এভাবেই শেষ হয়ে যাবে? এই প্রশ্ন এখন যশোরের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। একদিকে পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য, অন্যদিকে প্রভাবশালী বাদীর ষড়যন্ত্র এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ পরিবারের সন্তানরা। সংশ্লিষ্টরা দাবি তুলেছেন, দ্রুত এই মামলার উচ্চতর তদন্ত করা হোক এবং যে পুলিশ কর্মকর্তা ঘুষ গ্রহণ করেছেন তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। জিলা স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার্থে জেলা প্রশাসনকে দ্রুত হস্তাক্ষেপ করার অনুরোধ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। পরীক্ষা দিতে না পারা ওই দুই ছাত্রের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সময়টুকু আর কখনো ফিরে আসবে না, কিন্তু ন্যায়বিচার পেলে অন্তত তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ