সেনবাগে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান: ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ৮, অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের, ব্যুরো চীফ, নোয়াখালী:

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলায় অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমাতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে নেমেছে পুলিশ। সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় মাদকের বিস্তার ও ছোটখাটো অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সেনবাগ থানা পুলিশের একটি চৌকস দল উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে ১২ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ মোট ৮ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। শনিবার (১৮ জুলাই) দিনব্যাপী এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে মাদক আইন, মারামারি ও পুরনো মামলার ওয়ারেন্টসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। বিকেলে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের নোয়াখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে।

সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: আবদুর রহিম সরকারের নেতৃত্বে পুলিশের একাধিক টিম এই অভিযানে অংশ নেয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং এই অভিযানে তারা ১০০% সফল হতে চায়। অভিযানের শুরুতেই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মাদক বিক্রেতাদের আস্তানায় হানা দেয় পুলিশ। সেখান থেকে মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ এবং মো. আলাউদ্দিন ওরফে সুমনকে আটক করা হয়। তল্লাশি চালিয়ে তাদের কাছ থেকে ১২ পিস লাল রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, এই ছোট ছোট মাদক ব্যবসায়ীরাই এলাকার যুবসমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, এদের পেছনে বড় কোনো গডফাদার আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মাদক ছাড়াও পুরনো মামলার পলাতক আসামিদের ধরতে পুলিশ বেশ সক্রিয় ছিল। অভিযানে জিআর (General Register) গ্রেপ্তারী পরোয়ানাভুক্ত আসামি মো. রানা ওরফে টিপু সুলতানকে তার নিজ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রানা দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিল। এছাড়া এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও মারামারি মামলার অন্যতম আসামি শাহদাত হোসেনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, শাহদাতের মতো অপরাধীদের কারণে এলাকায় সামাজিক অস্থিরতা প্রায় ২০% থেকে ৩০% বেড়ে গিয়েছিল। তাকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অভিযানে পুলিশের আরেকটি বড় সাফল্য হলো সাজাপ্রাপ্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা। মো. মোরশেদ আলম নামের এক ব্যক্তিকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ইতিপূর্বে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছিল। কিন্তু মোরশেদ আইনের তোয়াক্কা না করে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। শনিবারের অভিযানে পুলিশ তাকে ধরতে সক্ষম হয়। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের এভাবে গ্রেপ্তার করার ফলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা অন্তত ৫০% বৃদ্ধি পাবে। আইন যে সবার জন্য সমান এবং অপরাধ করে কেউ পার পাবে না পুলিশের এই তৎপরতা সেই বার্তাই দিচ্ছে।

এদিকে, অভিযানে সন্দেহভাজন হিসেবে আরও তিনজনকে আটক করা হয়েছে। মাদক সেবনের আলামত ও অসংলগ্ন আচরণের কারণে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পুলিশ জানায়, সেনবাগের বিভিন্ন স্পটে উঠতি বয়সের ছেলেরা আড্ডা দেয় এবং সেখানে মাদকের লেনদেন হয় বলে প্রায়ই অভিযোগ পাওয়া যায়। এই ৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মাদকের মূল ডিলারদের তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন মনে করে, এভাবে যদি নিয়মিত অভিযান চালানো যায়, তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সেনবাগে অপরাধের হার প্রায় ৮০% কমিয়ে আনা সম্ভব।

সেনবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: আবদুর রহিম সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা সেনবাগকে একটি নিরাপদ ও সুন্দর জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। মাদক এবং সন্ত্রাসীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের এই বিশেষ অভিযান এখন থেকে নিয়মিতভাবে চলবে।” তিনি আরও বলেন যে, অভিযানে আটককৃত ৮ জনকেই ইতিমধ্যে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তবে শুধু পুলিশ দিয়ে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য এলাকার অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিকদের অন্তত ১০০% সহযোগিতা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি বা সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলে সরাসরি থানায় খবর দেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন।

শনিবারের এই অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে সেনবাগের সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে পুলিশের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, পুলিশের এই কড়াকড়ি থাকলে চুরিবাজি ও বখাটেদের উৎপাত কমবে। গত মাসে এলাকায় চুরির ঘটনা ১০% বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা পুলিশের বর্তমান তৎপরতায় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া মাদকাসক্তদের কারণে ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনাও ইদানীং বেড়েছে। তাই পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযানকে এলাকাবাসী ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।

পরিশেষে বলা যায়, নোয়াখালীর সেনবাগে পুলিশের এই অভিযান কেবল একটি রুটিন কাজ নয়, এটি অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের একটি বড় পদক্ষেপ। মাদক ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাজাপ্রাপ্ত আসামি পর্যন্ত কাউকেই ছাড় না দেওয়ার এই মানসিকতা বজায় থাকলে অপরাধীরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে। পুলিশ ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেনবাগ উপজেলা একদিন পুরোপুরি অপরাধমুক্ত হবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন জেলার সচেতন মহল। আদালতের নির্দেশে গ্রেপ্তারকৃতদের পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং পুলিশের এমন অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ