শিবপুরে পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফেরা হলো না নাফিজ ও স্বাধীনের: সড়ক দুর্ঘটনায় ২ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সাদ্দাম উদ্দিন রাজ, নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি:

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় আজ এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে যারা পরীক্ষার হলে কলম চালিয়েছিল, সেই দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর নিথর দেহ এখন রাস্তায় পড়ে আছে। শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুরে ইটাখোলা-মনোহরদী সড়কের বাজনাব এলাকায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নাফিজ ও স্বাধীন নামের দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে পুরো জেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের কান্নায় শিবপুরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে। যে বয়সে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখার কথা ছিল, সেই বয়সেই একটি বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় তাদের জীবনের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেল।

ঘড়িতে তখন ঠিক বেলা ১টা ২০ মিনিট। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে বাইকে চড়ে সহপাঠীরা যখন নিজেদের বাড়ির পথে রওনা দিয়েছিল, ঠিক তখনই বাজনাব এলাকায় ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মুরগি পরিবহনের খালি পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি ধাক্কা দেয় শিক্ষার্থীদের মোটরসাইকেলটিতে। ধারণা করা হচ্ছে, পিকআপটির গতি ছিল ঘণ্টায় অন্তত ৮০ কিলোমিটারেরও বেশি। সংঘর্ষ এতটাই তীব্র ছিল যে, মোটরসাইকেলটি দুমড়েমুচড়ে রাস্তা থেকে প্রায় ১৫ ফুট দূরে ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলেই দুই বন্ধুর মৃত্যু নিশ্চিত হয়। স্থানীয়রা ছুটে আসার আগেই তাদের প্রাণবায়ু উড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই পরীক্ষার শেষ হওয়ার আনন্দ এক গভীর বিষাদে রূপ নেয়।

নিহত দুই শিক্ষার্থীই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন। তারা দুজনেই কমার্স বিভাগ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন। তাদের সহপাঠীরা জানান, নাফিজ ও স্বাধীন দুজনেই পড়াশোনায় বেশ নিয়মিত ছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে পরিবারের হাল ধরা। উল্লেখ্য, এই বছর নরসিংদী জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫% বেড়েছে বলে একটি বেসরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। আজকের এই দুর্ঘটনা সেই ভয়াবহ পরিসংখ্যানকে আরও দীর্ঘ করল। পরিবারের একমাত্র সন্তানদের এমন অকাল মৃত্যুতে এলাকায় কোনো সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা যায়, তার মধ্যে প্রায় ২৫% থেকে ৩০% হলো কিশোর ও তরুণ শিক্ষার্থী। শিবপুরের এই দুর্ঘটনাটিও সেই নির্মম বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইটাখোলা-মনোহরদী এই সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং বেপরোয়া গতির কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। আজকের এই ঘটনায় যে পিকআপটি জড়িত ছিল, সেটি ঘটনার সময় খালি থাকায় চালক সম্ভবত কোনো নিয়ম না মেনেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। এর ফলে দুই শিক্ষার্থীর জীবনের মূল্য দিতে হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতায়। স্থানীয়দের দাবি, এই সড়কে ট্রাফিক আইন কড়াকড়ি না করলে এমন মৃত্যু থামানো সম্ভব নয়।

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই বাজনাব এলাকায় শত শত মানুষ ভিড় করেন। প্রত্যক্ষদর্শী এক পথচারী আক্ষেপ করে বলেন, “ছেলেগুলো খুব হাসিখুশি ছিল। হয়তো পরীক্ষার কোনো সহজ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করছিল। কিন্তু ঘাতক পিকআপটি তাদের সেই হাসিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিল।” পুলিশ আসার আগেই ঘাতক পিকআপের চালক পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও উত্তেজিত জনতা সড়ক অবরোধ করার চেষ্টা করে। দুর্ঘটনার পর ওই সড়কে প্রায় ৪০ মিনিট যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হয়, যার ফলে শত শত যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েন। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

শিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ কোহিনূর মিয়া দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পুলিশ খবর পাওয়ার সাথে সাথেই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ মরদেহ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনা কবলিত মোটরসাইকেল ও পিকআপ ভ্যানটি আমাদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। চালককে আটকের চেষ্টা চলছে।” তিনি আরও জানান যে, বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দ্রুত গতিতে বাইক চালানোর প্রবণতা ২০% থেকে ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই অভিভাবকদেরও সন্তানদের বাইক চালানোর বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।

এদিকে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবরে আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া কলেজে নেমে এসেছে শোকের আবহ। কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা খবর শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা জানান, নাফিজ ও স্বাধীন দুজনেই অত্যন্ত বিনয়ী ছাত্র ছিল। তাদের হারানোর ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। হাসপাতালের বারান্দায় নাফিজের বাবার আহাজারি দেখে উপস্থিত সাধারণ মানুষের চোখেও পানি চলে আসে। তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, “আমার ছেলে বলেছিল পরীক্ষা ভালো হয়েছে, ও ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু ওর লাশ নিয়ে আমি এখন বাড়ি যাব কীভাবে?” এমন দৃশ্য যেন পুরো এলাকার মানুষের মনকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সড়কগুলোতে স্পিড ডিটেক্টর এবং নজরদারি ব্যবস্থা ১০০% নিশ্চিত করা না গেলে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদের চলাচলের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। শিবপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, সড়কের অব্যবস্থাপনা কীভাবে তাজা প্রাণগুলোকে কেড়ে নিচ্ছে। নরসিংদীর এই দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যু কেবল তাদের পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং এটি পুরো দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। সচেতন নাগরিকরা এখন দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ