মোঃ হাসানুর জামান বাবু, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া এখন বন্যার পানিতে ভাসছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমন এক সংকটাপন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশে আজ ১৭ জুলাই শুক্রবার সকাল থেকেই সরাসরি মাঠে নেমেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী জনাব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রামের দক্ষিণ জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্টগুলোতে গিয়ে বন্যার্ত মানুষের হাতে ত্রাণ তুলে দেন। মন্ত্রীর এই সফর কেবল ত্রাণ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিজের চোখে দেখা এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রকাশও ছিল।
ত্রাণ বিতরণকালে মন্ত্রী দুর্গত এলাকার মানুষের মাঝে শুকনো খাবার, চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করেন। এছাড়া হাজার হাজার মানুষের মাঝে গরম রান্না করা খাবার এবং শীতবস্ত্র ও প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় তুলে দেওয়া হয়। এসময় আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “এই ত্রাণ বিতরণ মাত্র শুরু। বন্যার পানি পুরোপুরি না নামা পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। আমাদের সরকার জনগণের সরকার, তাই কোনো মানুষ যাতে অনাহারে না থাকে সেটি নিশ্চিত করতে আমরা ১০০% প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” তিনি আরও জানান যে, ত্রাণ বিতরণ কেবল তাৎক্ষণিক সমাধান নয়, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কাজ করছে সরকার।
বন্যার কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের কৃষিখাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৮০% ফসলি জমি এবং সবজি খেত বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এই কৃষকদের কথা মাথায় রেখে মন্ত্রী একটি বিশেষ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে উন্নত মানের বীজ, সার ও কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় কৃষি সরঞ্জাম বিতরণ করা হবে। এছাড়া সরকার কৃষি ঋণের কিস্তি স্থগিত রাখা এবং নতুন করে সুদহীন ঋণের ব্যবস্থা করার কথাও ভাবছে। অর্থ মন্ত্রী আশ্বাস দেন যে, কৃষকরা যাতে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের আর্থিক সহযোগিতা দেবে।
বন্যার ভয়াবহতায় অসংখ্য মানুষের কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। এই গৃহহীন মানুষদের নিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় পরিবারগুলোকে নতুন করে গৃহনির্মাণ করে পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত আমাদের সরকার শান্তি পাবে না।” তিনি ঘোষণা করেন যে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে পর্যায়ক্রমে তাদের পাকা ঘর তৈরি করে দেওয়া হবে। পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় যাতে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতি না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেন তিনি। প্রাথমিক হিসেব অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবারকে এই পুনর্বাসন সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
সকাল থেকে শুরু হওয়া এই ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিতে মন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেন দ্রুততার সাথে জলাবদ্ধতা নিরসন করতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য সংগ্রহ করতে। এছাড়া বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া এলাকার সংসদ সদস্যরাও নিজ নিজ এলাকার মানুষের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে মন্ত্রীর সাথে আলোচনা করেন। তারা সবাই মিলে একযোগে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার শপথ নেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকা থেকে ১০০-এর বেশি স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করেছেন ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য।
ত্রাণ বিতরণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে অন্যান্যের মাঝে আরও উপস্থিত ছিলেন বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনের সংসদ সদস্য জনাব এরশাদ উল্লাহ্, কোতোয়ালি আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চন্দনাইশ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ জসিম উদ্দিন এবং পটিয়া আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম। এছাড়া সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরীসহ চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ মন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন। তারা সবাই বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের কাছে খাবার ও চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন।
দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ্ব ইদ্রিস মিয়া এবং সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিনের তদারকিতে কয়েক হাজার দলীয় কর্মী এই ত্রাণ কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। বাঁশখালী আসনের বিএনপি প্রার্থী মিসকাতুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পা এবং সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার নাজমুল মোস্তফা আমিন নিজ নিজ এলাকার দুর্গম গ্রামগুলোতে গিয়ে মানুষের খবর নিচ্ছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের এমন সরব উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে অনেক সাহস জুগিয়েছে। মন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই সংকটে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষের সেবা করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
পরিশেষে অর্থ মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের যাতায়াত ও দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতা দূর করতে বড় ধরণের একটি মেগা প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হচ্ছে। বন্যায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির জন্য সরকার বিশেষ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে জরুরি বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারাও সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ান। দিনভর চলা এই ত্রাণ কর্মসূচি শেষে মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে একটি বৈঠক করেন এবং উদ্ধার কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। সরকারের এই তৎপরতায় চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
















