ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া: বিএসএফকে ১০০০ একর জমি দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার। গত মে মাসে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) কাছে ১০০০ একরেরও বেশি জমি হস্তান্তর করেছে রাজ্যটি। মূলত সীমান্তে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ দ্রুত শেষ করতেই এই বিপুল পরিমাণ জমি দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মঙ্গলবার তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টের মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সীমান্ত এলাকা সুরক্ষিত রাখাই এখন তাদের সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তার পোস্টে লিখেছেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে নিশ্ছিদ্র করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই অঙ্গীকার রক্ষার্থেই বিএসএফের হাতে প্রয়োজনীয় জমি তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুতগতিতে শেষ করা হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৭২.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় বেড়া দেওয়ার জন্য মোট ১,০২৪.৭৫ একর জমি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসএফকে দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণার ফলে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় নতুন করে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ আরও গতি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের এই উদ্যোগকে সীমান্ত সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

জমি হস্তান্তরের এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলা। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বিএসএফকে দেওয়া মোট জমির প্রায় ৩৩% এসেছে এই একটি জেলা থেকে। মুর্শিদাবাদে ৪৫.৪ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য ৩৩৭ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে। উল্লেখ্য, মুর্শিদাবাদ পশ্চিমবঙ্গের এমন একটি জেলা যেখানে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের। এই জেলায় সীমান্ত অনেক বেশি সর্পিল এবং উন্মুক্ত হওয়ায় সেখানে বেড়া দেওয়াকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে রাজ্য সরকার। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই জেলার জমি হস্তান্তরের কাজ সবার আগে শেষ করা হয়েছে।

মুর্শিদাবাদের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জমি দেওয়া হয়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায়। এখানে ৪২.৭ কিলোমিটার সীমান্ত জুড়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য ২৪১.০৩ একর জমি বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। উত্তর চব্বিশ পরগনার সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাণিজ্য ও মানুষের যাতায়াত সবচেয়ে বেশি থাকে, তাই এখানকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বিএসএফের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া কোচবিহার জেলায় ৩৯.৩৯ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য ১৩৫.৩৩ একর জমি এবং মালদা জেলায় ২০.১৫ কিলোমিটার এলাকার জন্য ১৭৬.৭৮ একর জমি দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত এলাকার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ফলে চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ অনেকাংশে কমে আসবে বলে সরকার আশা করছে।

তালিকায় থাকা অন্যান্য জেলার মধ্যে নদীয়া জেলার ১৪.৭৯ কিলোমিটার এলাকার জন্য ৯৫.১১ একর জমি দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ দিনাজপুরে ৭.৭৫ কিলোমিটারের জন্য ২৬.৪১ একর এবং উত্তর দিনাজপুরে ১.২৮ কিলোমিটার সীমান্তের জন্য ৬.৬১ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া উত্তরের পাহাড়ি জেলা দার্জিলিংয়ে ১.৪৫ কিলোমিটারের জন্য ৪.৩১ একর এবং জলপাইগুড়িতে মাত্র ০.৩১ কিলোমিটার এলাকার জন্য ২.১৭ একর জমি বিএসএফের হাতে তুলে দিয়েছে রাজ্য সরকার। প্রতিটি জেলার ক্ষেত্রে জমি হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়া গত কয়েক মাসের মধ্যে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শেষ করা হয়েছে।

শুভেন্দু অধিকারী তার বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করাই তার সরকারের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, “সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অনেক সময় নিরাপত্তার অভাব দেখা দেয়। কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অবিচল রয়েছি যে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই বেড়া নির্মাণের কাজ শেষ করতে হবে।” তার মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সমন্বয় করে কাজ করার ফলে এই বিশাল কাজ খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে।

সীমান্তের এই কড়াকড়ি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় এরই মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, সীমান্তজুড়ে বেড়া দেওয়ার ফলে অনেক মানুষের চাষাবাদের জমি বা চলাচলের পথ সংকুচিত হতে পারে। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বলছে, তারা দেশের স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিচ্ছে। ১০০০ একরের বেশি এই জমি হস্তান্তরের ফলে বিএসএফের হাতে এখন আইনত ক্ষমতা থাকবে ওই নির্দিষ্ট এলাকায় দ্রুত অবকাঠামো তৈরি করার। এর আগে জমি নিয়ে জটিলতার কারণে অনেক জায়গায় কাঁটাতারের কাজ কয়েক বছর ধরে ঝুলে ছিল, যা এখন সমাধানের পথে।

সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের এই নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে রেষারেষি ছিল, সেখানে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার বিএসএফের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৭২.৬ কিলোমিটার জুড়ে এই নতুন বেড়া নির্মাণের কাজ শেষ হলে তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তার পোস্টে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যেকোনো মূল্যে তারা সীমানা সুরক্ষিত রাখবেন এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো আপস করবেন না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ