তাজমুল হোসেন, বাগেরহাট জেলা সংবাদদাতা:
জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি আজ আবার বাগেরহাটের মানুষের হৃদয়ে হাহাকার বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘জুলাই শহীদ দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে বাগেরহাটের ৫ জন অকুতোভয় শহীদের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা শাখার শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ভোরবেলা থেকেই শুরু হয় এই আবেগঘন কর্মসূচি। জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা রেজাউল করিমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল প্রথমে বাগেরহাট সদর উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রামে পৌঁছান। সেখানে তারা শহীদ আলিফ আহমেদ সিয়ামের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করেন এবং বিশেষ দোয়া করেন। সিয়ামের বাবা বুলবুল কবির যখন তার কিশোর ছেলের কবরের পাশে বসে কাঁদছিলেন, তখন সেখানে উপস্থিত নেতাকর্মীদের চোখেও জল দেখা যায়। নেতৃবৃন্দ প্রতিটি শহীদ পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং তাদের পাশে থাকার ১০০% নিশ্চয়তা দেন।
এরপর নেতৃবৃন্দ ছুটে যান গোপালকাটি গ্রামে, যেখানে শায়িত আছেন শহীদ আলমগীর মোল্লা। তার কবরের পাশে গিয়েও তারা দোয়া ও মোনাজাত করেন। বাগেরহাট জেলা জামায়াতের আমির ছাড়াও এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন জেলা অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মোস্তাইন বিল্লাহ এবং জেলা কর্ম পরিষদ সদস্য অধ্যাপক রেজাউল করিম। একই দিনে জেলার আরও ৩টি স্থানে পৃথক প্রতিনিধি দল পাঠানো হয়েছিল। মোড়েলগঞ্জ, চিতলমারী এবং মোল্লারহাট উপজেলার শহীদদের কবরের পাশে গিয়ে তারা দোয়ায় শরিক হন। এই দিনটি ছিল শহীদদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টের, কারণ তাদের কলিজার টুকরো সন্তানদের হারানোর ক্ষত আজও শুকায়নি। জামায়াত নেতারা ঘোষণা দেন যে, শহীদদের এই ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে তারা যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।
চিতলমারী ও মোল্লারহাট উপজেলায় শহীদদের কবরের পাশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা ও খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা মশিউর রহমান খান এম.পি। তিনি চিতলমারীর হিজলা গ্রামে শহীদ মোহাম্মদ সাব্বির ইসলাম সাকিব এবং মোল্লারহাটের বুড়িগাংনী গ্রামে শহীদ বিপ্লব শেখের কবর জিয়ারত করেন। সাকিবের বাবা মোঃ শহিদুল মন্ডল তার ছেলের বীরত্বের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সাকিব ছিল চিতলমারী শেরে বাংলা ডিগ্রী কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। মাত্র ১৯ বছর বয়সে দেশের জন্য সে বুক পেতে দিয়েছিল। বক্তারা বলেন, এ দেশের ছাত্র-জনতা যে রক্ত দিয়েছে, তার বিনিময়ে আজ আমরা মুক্ত বাতাসে কথা বলতে পারছি। এই বিপ্লবে প্রায় ৯৫% সাধারণ মানুষের সমর্থন ছিল বলেই স্বৈরাচারী শাসনের পতন হয়েছে।
মোড়েলগঞ্জ উপজেলার হরতকি তলা গ্রামে শহীদ মাহফুজুর রহমানের কবর জিয়ারতে অংশ নেন জেলা জামায়াতের কর্ম পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ আব্দুল আলিম এম.পি। তার সাথে ছিলেন খুলনা মহানগরী জামায়াত নেতা অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম এবং মোড়েলগঞ্জ উপজেলা আমির মাওলানা শাহাদাত হোসাইন। ১৯ জুলাইয়ের সেই স্মৃতি মনে করে বক্তারা বলেন, সেদিন মিরপুরে যে রক্তগঙ্গা বয়ে গিয়েছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে। মাত্র দশম শ্রেণির ছাত্র মাহফুজুর রহমান সেদিন রাজপথে নেমেছিল দেশের মুক্তির জন্য। তার মতো হাজারো তরুণের আত্মত্যাগের কারণেই আজ বাংলাদেশ একটি নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে। শহীদ মাহফুজের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নেতারা বলেন, তার রক্ত বৃথা যেতে দেব না।
শহীদ মোহাম্মদ সাব্বির ইসলাম সাকিবের শহীদ হওয়ার গল্পটি ছিল অত্যন্ত রোমহর্ষক। ১৯ জুলাই সন্ধ্যা ঠিক ৬টায় ঢাকার উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে পুলিশের গুলিতে সে প্রাণ হারায়। সাকিব টঙ্গীতে তার বোনের বাড়িতে গিয়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। সেদিন সে ছিল মিছিলের একদম সামনে। পুলিশ যখন অতর্কিতে গুলি শুরু করে, তখন সাকিবের মাথায় ২ টি এবং বুকে ৩ টি গুলি লাগে। মোট ৫ টি বুলেটে তার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। তার বন্ধুরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। সাকিবের মতো মেধাবী ছাত্রের এমন অকাল মৃত্যু পুরো বাগেরহাটবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তার পরিবারের সদস্যরা আজও তার ছবি বুকে ধরে আর্তনাদ করেন।
একই দিনে ঢাকার মিরপুরে শহীদ হন বিপ্লব শেখ। তিনি ছিলেন একজন পরিশ্রমী গার্মেন্টস কর্মী। বিপ্লব তার উপার্জনের একটি বড় অংশ তার পরিবারকে সাহায্য করার জন্য খরচ করতেন। কিন্তু ১৯ জুলাই বিকেলে যখন মিরপুর ১০ নম্বরে ছাত্র-জনতার সাথে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সংঘর্ষ বাঁধে, তখন বিপ্লব ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনি মিছিলে যোগ দেন এবং পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন। তার মাথায় এবং পিঠে গুলি লেগেছিল। বিপ্লবের নিথর দেহ যখন গ্রামে পৌঁছায়, তখন গ্রামবাসীর মধ্যে ১০% মানুষও ছিল না যারা চোখের পানি ফেলেননি। আজ তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নেতারা বলেন, বিপ্লব কেবল একজন শ্রমিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় যোদ্ধা।
আরেক কিশোর শহীদ আলিফ আহমেদ সিয়ামের গল্পটি আরও বেশি বেদনাদায়ক। সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দশম শ্রেণির এই ছাত্রটি প্রতিদিনই আন্দোলনে যেত। ৫ আগস্ট যখন গণভবন অভিমুখে যাত্রা শুরু হয়, তখন দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে পুলিশের গুলি তার মাথায় বিদ্ধ হয়। সাভার এনাম মেডিকেলে ২ দিন যমে-মানুষে টানাটানির পর ৭ আগস্ট সিয়াম না ফেরার দেশে চলে যায়। সিয়ামের মতো কিশোরদের আত্মত্যাগই চূড়ান্ত বিজয় ত্বরান্বিত করেছিল। বাগেরহাট জামায়াত নেতৃবৃন্দ বলেন, শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে তারা জেলার বিভিন্ন মোড়ে শহীদদের নামে স্মৃতিফলক স্থাপনের উদ্যোগ নেবেন। প্রতিটি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের আর্থিক ও সামাজিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন তারা।
সদর উপজেলার বাড্ডায় শহীদ হওয়া আলমগীর মোল্লার কবরেও জিয়ারত সম্পন্ন হয়। সবশেষে সকল শহীদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে সম্মিলিত মোনাজাত করা হয়। নেতারা বলেন, বর্তমান বাংলাদেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে শহীদদের আদর্শকে ভুলে গেলে চলবে না। তারা আরও যোগ করেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নয়, বরং এ দেশের গর্বিত সন্তান হিসেবে এই বীরদের শ্রদ্ধা জানানো প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। বাগেরহাটের মানুষ আজকের এই শহীদ দিবসকে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে পালন করেছেন। দিনের শেষে একটি বিশাল র্যালির মাধ্যমে কর্মসূচি সমাপ্ত হয়, যেখানে কয়েক হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন এবং শহীদদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন।
















