মোঃ আসাদুজ্জামান, পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:
স্মৃতিতে আজও অমলিন ২০২৪ সালের সেই উত্তাল জুলাই। রাজপথে ছাত্র-জনতার বুক চিরে বেরিয়ে আসা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বাংলার মাটি। সেই ত্যাগের মহিমাকে স্মরণ করতে এবং শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে পালিত হয়েছে ‘জুলাই শহীদ দিবস-২০২৬’। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বেলা ১১টায় পীরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে এক বিশেষ আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকীর এই দিনে পীরগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ যেন এক আবেগঘন পরিবেশে মিলিত হয়েছিলেন। সভায় আসা সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে ছিল শহীদদের হারানো শোক, আর হৃদয়ে ছিল একটি সুন্দর ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় সংকল্প।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদার। সভার শুরুতে জুলাই বিপ্লবের সকল শহীদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ইউএনও তার বক্তব্যে বলেন, “জুলাইয়ের শহীদরা আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। তাদের এই ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারব না। তবে আমাদের দায়িত্ব হলো ১০০% সততা নিয়ে দেশ গড়া। শহীদদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ, যেখানে সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য অধিকার পাবে। আমরা যদি সেই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হই, তবে তাদের আত্মা শান্তি পাবে না।” তিনি আরও জানান, সরকারি দপ্তরে সাধারণ মানুষের সেবার মান ১০০% নিশ্চিত করাই হবে শহীদদের প্রতি শ্রেষ্ঠ উপহার।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এন এম ইশফাকুল কবীর ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ। এছাড়াও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করেন পীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইকবাল হোসেন প্রামানিক। ওসি বলেন, “পুলিশ এখন জনগণের প্রকৃত বন্ধু হতে চায়। অতীতে পুলিশের ওপর মানুষের যে আস্থার সংকট ছিল, তা কাটিয়ে আমরা এখন জনগণের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছি। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশে অপরাধীদের কোনো ছাড় নেই। আমরা একটি শান্তিময় পীরগঞ্জ গড়তে বদ্ধপরিকর।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে উপজেলার মানুষের নিরাপত্তা ৯০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের নেতৃবৃন্দও এই স্মরণ সভায় অংশ নিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জিয়াউল ইসলাম জিয়া বলেন, “জুলাইয়ের গণআন্দোলন ছিল এ দেশের মানুষের দ্বিতীয় মুক্তি সংগ্রাম। ছাত্র-জনতা যখন রাস্তায় নেমেছিল, তারা দল-মত দেখেনি, তারা দেখেছিল দেশের মুক্তি। আজ আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই চেয়ার বা ক্ষমতা আমাদের নয়, এটি জনগণের আমানত। ইনসাফ ও ন্যায়ের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।” জামায়াতের আমীর বাবুল আহম্মেদ তার বক্তব্যে বলেন, “শহীদের রক্ত বৃথা যায় না। এই ত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি, তাকে রক্ষা করতে আমাদের পাহাড়ের মতো অটল থাকতে হবে। ইনসাফ কায়েম না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে।”
অনুষ্ঠানে সবচেয়ে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয় যখন জুলাইয়ের আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ যোদ্ধা তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাদের বর্ণনায় উঠে আসে সেই ভয়াল দিনগুলোর কথা, যখন চারদিকে ছিল টিয়ারশেল আর গুলির শব্দ। একজন তরুণ যোদ্ধা বলেন, “আমার পাশে থাকা বন্ধুটি যখন গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ল, তখন মনে হয়েছিল দেশটা বোধহয় আর বাঁচবে না। কিন্তু মানুষের অভাবনীয় সাহস আমাদের জয়ী করেছে।” সভায় উপস্থিত মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জিন্নাতারা ইয়াসমিনও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই বিপ্লবে অংশ নেওয়াটাই ছিল সাফল্যের চাবিকাঠি।
পীরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি জয়নাল আবেদীন বাবুল এবং সাধারণ সম্পাদক নসরতে খোদা রানা সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, গণমাধ্যমকর্মীরাও সেই সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। সঠিক তথ্য প্রচারের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী জানতে পেরেছিল বাংলাদেশে কী ঘটছে। সাংবাদিকরা আরও বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে এই বীরত্বগাথা পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাঠ্যবইয়ে জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। বক্তারা মনে করেন, দেশের প্রায় ৮০% তরুণ আজ শহীদদের আদর্শে অনুপ্রাণিত, যা একটি ইতিবাচক দিক। সভায় ৬নং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোখলেসুর রহমান চৌধুরীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বক্তারা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়েও কথা বলেন। তারা উল্লেখ করেন যে, জুলাই বিপ্লবের পর দেশে এখন বিনিয়োগ ও উন্নয়নের এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদি আমরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ২% থেকে ৩% হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারি, তবে শহীদদের স্বপ্নপূরণ হবে দ্রুত। সভায় উপস্থিত সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, দেশের প্রতিটি সেক্টরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তারা দুর্নীতিকে ০% এ নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেন। উপস্থিত শিক্ষকরা বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারলেই একটি সুন্দর সমাজ গঠন সম্ভব।
সভার শেষ পর্যায়ে জুলাইয়ের সকল শহীদদের আত্মার মাগফিরাত এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম। দোয়ার সময় উপস্থিত অনেকের চোখই ছলছল করছিল। দেশ ও জাতির শান্তি-সমৃদ্ধির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা হয়। এই আলোচনা সভাটি কেবল একটি অনুষ্ঠান ছিল না, বরং এটি ছিল পীরগঞ্জবাসীর পক্ষ থেকে শহীদদের প্রতি হৃদয়ের নিংড়ানো ভালোবাসা এবং আগামী দিনের সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার এক নতুন অঙ্গীকার।
















