রায়পুরায় এক নিমিষেই শেষ ৪টি প্রাণ: নদীতে গোসল করতে নেমে ৪ মাদরাসাছাত্রীর করুণ মৃত্যু

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সাদ্দাম উদ্দিন রাজ, নরসিংদী প্রতিনিধি:

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় আজ এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে যা পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। চারজন ছোট্ট শিশু, যারা সকালে হাসিমুখে মাদরাসায় গিয়েছিল, তারা আর জীবিত ঘরে ফেরেনি। কাকন নদীর উত্তাল জল কেড়ে নিয়েছে এই কোমলমতি চার মাদরাসাছাত্রীর প্রাণ। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে উপজেলার চান্দেরকান্দি ইউনিয়নের বরকান্দা এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহতরা সবাই স্থানীয় গাউছিয়া নূরে মদিনা মহিলা মাদরাসার শিক্ষার্থী ছিল। এই ঘটনায় পুরো গ্রাম জুড়ে এখন চলছে শোকের মাতম, শত শত মানুষ নদীর পাড়ে ভিড় জমিয়েছেন তাদের শেষবারের মতো দেখতে।

নিহত চার ছাত্রীর পরিচয় পাওয়া গেছে এবং তাদের প্রত্যেকের বয়সই ১০ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে। তারা হলো—বড়কান্দা গ্রামের শামীম মিয়ার মেয়ে তাবিয়া (১৩), একই এলাকার রুবেল মিয়ার মেয়ে জান্নাত ইসলাম (৯), রুবেল মিয়ার আরেক মেয়ে আশেয়া (৯) এবং বিল্লাল মিয়ার মেয়ে সুমাইয়া (১০)। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, রুবেল মিয়া একই দিনে তার দুই কলিজার টুকরো কন্যা জান্নাত ও আশেয়াকে হারিয়েছেন। এই পরিবারের শোকের মাত্রা এখন ১০০% ছাড়িয়ে গেছে, যা কোনো সান্ত্বনা দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। পাড়া-প্রতিবেশীরা বলছেন, এমন দৃশ্য তারা আগে কখনো দেখেননি।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো দুপুরে মাদরাসার ছুটি হওয়ার পর ৬ থেকে ৭ জন শিশু শিক্ষার্থী একত্রে বাড়ির পথে রওনা দেয়। ফেরার পথে তারা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কাকন নদীতে গোসল করার সিদ্ধান্ত নেয়। কেউ ভাবেনি এই সিদ্ধান্তই তাদের জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হবে। গোসলের এক পর্যায়ে হঠাৎ একজন শিক্ষার্থী গভীর পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। তাকে ডুবে যেতে দেখে বাকিরা ভয় পেয়ে যায় এবং সাহসী হয়ে একে অপরকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু পানির প্রবল স্রোত আর সাঁতার না জানার কারণে তারা ৪ জনই একপর্যায়ে পানির নিচে নিখোঁজ হয়ে যায়। সাথে থাকা অন্য ২ শিশু কোনোমতে পাড়ে উঠে চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসে।

গ্রামবাসীরা জানান, চিৎকার শুনে মাঠের কাজ ফেলে ১০-১২ জন লোক সাথে সাথে নদীতে ঝাঁপ দেন। প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট খোঁজাখুঁজির পর তারা প্রথমে তিনজনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। উদ্ধার হওয়া শিশুদের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক ছিল। দেরি না করে দ্রুত তাদের রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাদের শরীর নিথর হয়ে গিয়েছিল। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, সুমাইয়া নামের আরেক শিশু তখনও নিখোঁজ ছিল। এলাকাবাসী আরও দীর্ঘ সময় তল্লাশি চালিয়ে নদীর তলদেশ থেকে সুমাইয়ার নিথর দেহ উদ্ধার করে। অর্থাৎ ওই নদীর ঘাটে খেলতে গিয়ে ৪ জনই প্রাণ হারাল।

রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আশরাফুর রহমান বলেন, “দুপুর আড়াইটার দিকে স্থানীয় লোকজন তিনটি শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, হাসপাতালে আনার অন্তত ১০-১৫ মিনিট আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছিল। আমরা শতভাগ চেষ্টা করেও তাদের হৃদস্পন্দন ফিরে পাইনি। পানিতে ডুবে ফুসফুসে অতিরিক্ত পানি ঢুকে যাওয়ার কারণেই মূলত তাদের মৃত্যু হয়েছে।” চিকিৎসকদের এই ঘোষণা শোনার পর হাসপাতালের করিডোরে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। শোকাতুর বাবা-মায়ের আহাজারিতে সেখানে উপস্থিত সাধারণ রোগীদের চোখেও জল চলে আসে।

রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মজিবুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “নদীতে ডুবে ৪ শিশুর মৃত্যুর খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে পুলিশ পাঠিয়েছি। আমরা ইতিমধ্যে ৩ শিশুর লাশ শনাক্ত করেছি এবং অন্যজনের মরদেহ উদ্ধারের খবরও পেয়েছি। এটি একটি অত্যন্ত দুঃখজনক দুর্ঘটনা। আমরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছি এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।” তিনি আরও জানান যে, পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন, বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন নদীর পানি বেড়ে যায়।

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল নরসিংদীতে নয়, বরং সারা দেশেই এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। গ্রামীণ এলাকায় সাঁতার না জানা এবং শিশুদের ওপর সঠিক নজরদারির অভাব এই মৃত্যুর হার ১০০% বাড়িয়ে দিচ্ছে। বড়কান্দা গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, কাকন নদীতে বর্তমানে পানির গভীরতা প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট। এই গভীরতায় ছোট শিশুদের নামাটা একেবারেই নিরাপদ ছিল না। অথচ সামান্য অসাবধানতায় আজ চারটি পরিবারের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। গ্রামের মানুষ এখন এই শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি খুঁজছে।

বিকেলে যখন ৪ শিশুর মরদেহ নিজ নিজ বাড়িতে নেওয়া হয়, তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সাদা কাফনে মোড়ানো ছোট ছোট দেহগুলো দেখে গ্রামের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ছোট শিশুরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। তাদের জানাজার প্রস্তুতির কাজ চলছে এবং আজ রাতেই স্থানীয় কবরস্থানে তাদের দাফন করা হবে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সাহায্য ও সহমর্মিতা জানানোর আশ্বাস দিয়েছেন। তবে কোনো অর্থই কি আর এই চার নক্ষত্রকে ফিরিয়ে দিতে পারবে? প্রশ্নটি এখন বড়কান্দা গ্রামের প্রতিটি মানুষের মনে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ