চুয়াডাঙ্গায় বিজিবির বড় সাফল্য: ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকার স্বর্ণসহ পাচারকারী আটক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা সীমান্তে বিজিবির এক দুঃসাহসিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। ভারতে পাচারের সময় ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকারও বেশি মূল্যের ৮টি স্বর্ণের বারসহ এক পাচারকারীকে হাতেনাতে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বুধবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের মুন্সিপুর বিওপির সামনের সড়ক থেকে তাকে আটক করা হয়। আটককৃত ব্যক্তির নাম মো. মিজানুর রহমান (৬১)। তিনি দামুড়হুদা উপজেলার পিরপুরকুল্লা গ্রামের মৃত সোলেমান মোল্লার ছেলে। এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

বিজিবি সূত্র থেকে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হাসান গোপন সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, মুন্সিপুর সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণের একটি বড় চালান পাচার হতে যাচ্ছে। এই খবর পাওয়ার সাথে সাথেই বিজিবির একটি বিশেষ টহল দল ওই এলাকায় কৌশলগত অবস্থান নেয় এবং নজরদারি প্রায় ১০০% বাড়িয়ে দেয়। বিজিবি সদস্যরা ওত পেতে থাকেন কখন পাচারকারী সেই পথে আসবে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সীমান্তের প্রতিটি মোড়ে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয় যাতে কোনোভাবেই অপরাধী ফসকে যেতে না পারে।

সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দেখা যায়, কার্পাসডাঙ্গা বাজার থেকে একটি মোটরসাইকেল চালিয়ে একজন ব্যক্তি মুন্সিপুর বিওপির দিকে আসছেন। বিজিবি সদস্যরা তাকে থামার সংকেত দিলে তিনি মোটরসাইকেলের গতি কমিয়ে কিছুটা ঘাবড়ে যান। সন্দেহভাজন হিসেবে বিজিবি সদস্যরা তাকে আটকে ফেলে এবং স্থানীয় ৮-১০ জন মানুষের উপস্থিতিতে তার শরীর তল্লাশি শুরু করে। তল্লাশির এক পর্যায়ে তার কোমরে লুঙ্গির ভাঁজে বিশেষ কায়দয় লুকানো একটি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। প্যাকেটটি খোলার পর সেখানে দেখা যায় ঝকঝকে ৮টি স্বর্ণের বার।

উদ্ধারকৃত এই ৮টি স্বর্ণের বারের ওজন প্রায় ৯৩২ গ্রাম। বিজিবি নিশ্চিত করেছে যে, বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী এই স্বর্ণের মূল্য ১ কোটি ৭৬ লাখ ১ হাজার ২৩০ টাকা। এছাড়া পাচারের কাজে ব্যবহৃত ডায়ান ডিওয়াই-৫০ (DY50) মডেলের একটি মোটরসাইকেল এবং একটি বাটন মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছে। বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিজানুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে এই সীমান্ত দিয়ে ছোট-বড় চোরাচালান করে আসছিলেন। তবে এবারের চালানটি ছিল বেশ বড় এবং এটি ভারতে পৌঁছে দিতে পারলে তিনি বড় অংকের কমিশন পেতেন।

চুয়াডাঙ্গার এই সীমান্ত এলাকাগুলো ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পাচারকারীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তবে গত কয়েক মাসে বিজিবির নিয়মিত অভিযানের ফলে এই পথে চোরাচালানের হার প্রায় ৩০% কমে এসেছে বলে দাবি করছে স্থানীয় প্রশাসন। আটককৃত মিজানুর রহমানকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দামুড়হুদা মডেল থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে চোরাচালান বিরোধী আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করার প্রক্রিয়া চলছে। জব্দকৃত স্বর্ণগুলো সরকারি কোষাগারে বা চুয়াডাঙ্গা ট্রেজারি অফিসে জমা দেওয়ার কার্যক্রম বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সীমান্ত দিয়ে এভাবে স্বর্ণ পাচার হয়ে গেলে দেশের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হয়। ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকার এই চালানটি উদ্ধার হওয়ায় তারা বিজিবিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সীমান্তের সাধারণ মানুষ বলছেন, বিজিবি যদি এভাবে কঠোর অবস্থানে থাকে, তবে এই এলাকায় ৯০% অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব। বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “সীমান্ত দিয়ে মাদক, স্বর্ণ বা অন্য কোনো অবৈধ পণ্য পাচার রোধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি বজায় থাকবে। ভবিষ্যতে আমাদের এই গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।”

পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে যে মিজানুর রহমানের সাথে আর কারা এই আন্তর্জাতিক পাচার চক্রে জড়িত আছে। তার মোবাইল ফোনের কল লিস্ট পরীক্ষা করে বেশ কিছু সন্দেহভাজন নম্বর পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই চক্রের পেছনে স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী মহলের হাত থাকতে পারে। বিজিবি ও পুলিশ মিলে এই সিন্ডিকেট ভাঙতে ১০-১৫ দিনের একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতেও কাজ করছে বিজিবি, যাতে কেউ লোভে পড়ে পাচারকারীদের সাহায্য না করে।

পরিশেষে বলা যায়, বিজিবির এই সময়োপযোগী অভিযান দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকার এই স্বর্ণ উদ্ধার কেবল একটি সাফল্য নয়, এটি চোরাকারবারিদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। দামুড়হুদা এলাকার বাসিন্দারা চান, শুধু স্বর্ণ নয়, সীমান্ত দিয়ে গরু, মাদক এবং অন্যান্য চোরাচালানও যেন একইভাবে বন্ধ করা হয়। প্রশাসন আশা করছে, নিয়মিত টহল এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গা সীমান্তকে ১০০% নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ