ইংল্যান্ডকে কাঁদিয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনা: বিশ্ব ফুটবলে এবার ইউরো বনাম কোপা চ্যাম্পিয়নের লড়াই

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে তখন উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, তখন ইতিহাসের পাতায় এক নতুন অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে। বিশ্বকাপের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার ফুটবল বিশ্ব এমন এক ফাইনাল দেখতে যাচ্ছে, যা আগে কখনো ঘটেনি। আগামী রোববার শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে ইউরোপের সেরা স্পেন এবং দক্ষিণ আমেরিকার রাজা আর্জেন্টিনা। এই প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন ও বর্তমান কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আর্জেন্টিনার প্রায় ৯৮% মানুষ স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলেন। সেই হিসেবে ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপের প্রথম আসরে উরুগুয়ে-আর্জেন্টিনা ফাইনালের পর এটি হতে যাচ্ছে স্প্যানিশ ভাষাভাষী দুটি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় ফাইনাল।

ফাইনাল নিশ্চিত করতে গতকাল রাতে আর্জেন্টিনাকে লড়তে হয়েছে ইংল্যান্ডের মতো কঠিন এক প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। ম্যাচের ৫৫ মিনিটের মাথায় ইংলিশ ফরোয়ার্ড অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে যখন আর্জেন্টিনা পিছিয়ে পড়ে, তখন গ্যালারিতে থাকা নীল-সাদা সমর্থকদের মনে আশঙ্কার মেঘ জমেছিল। কিন্তু ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ এবং যোগ করা সময়ের ৯২ মিনিটে (৯০+২) লাউতারো মার্তিনেজের জাদুকরী গোল পুরো চিত্র বদলে দেয়। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট হাতে নেয় লিওনেল মেসির দল। পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তাতে মনে হচ্ছিল জয় পাওয়াটা ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার। এই জয় আর্জেন্টাইন ভক্তদের জন্য ছিল এক পরম স্বস্তির।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ম্যাচের এক পর্যায়ে ইংল্যান্ড কতটা কোণঠাসা ছিল। ৫৫ মিনিটে গোল করার পর থেকে ৮৫ মিনিটে সমতা ফেরার মাঝের এই ৩০ মিনিটে ইংল্যান্ডের কাছে বলের দখল ছিল মাত্র ১২%। এই পুরো সময়টায় ইংল্যান্ড তাদের আক্রমণভাগে মাত্র ৯ বার বল ছুঁতে পেরেছে, যা আর্জেন্টিনার তুলনায় ১৬৫ বার কম। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল লিড পাওয়ার পর থেকেই রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলার নির্দেশ দেন। তিনি বেঞ্চ থেকে ডিফেন্ডার ড্যান বার্নকে মাঠে নামিয়ে হয়তো গোল বাঁচানোর মিশনে নেমেছিলেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার বিশ্বসেরা আক্রমণভাগের সামনে সেই দেয়াল বেশিক্ষণ টেকেনি। টুখেলের এই অতিরক্ষণাত্মক কৌশল এখন ফুটবল মহলে বেশ সমালোচিত হচ্ছে।

বরাবরের মতোই ম্যাচের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন লিওনেল মেসি। গোল না করলেও দলের জয়ে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। মেসি যখন ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ শানাচ্ছিলেন, তখন ইংলিশ ডিফেন্ডাররা বারবার খেই হারিয়ে ফেলছিলেন। বক্সের বাইরে থেকে এনজো ফার্নান্দেজের সেই দুর্দান্ত শটটি ম্যাচে সমতা আনে। আর যোগ করা সময়ের সেই মুহূর্তটি ছিল নিছক জাদুকরী। মেসির সেই নিখুঁত পাস থেকেই জয়সূচক গোলটি করেন মার্তিনেজ। উল্লেখ্য, এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ৭৫ মিনিটের পরে মোট ১১টি গোল করেছে। শেষ মুহূর্তে গোল করে ম্যাচ বের করে আনাটা যেন এই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার এক ‘সিগনেচার মার্ক’ বা বিশেষ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।

ইংল্যান্ডের জন্য এই পরাজয় যেন ১৯৯০ বা ২০১৮ বিশ্বকাপের সেই দুঃসহ স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। ১৯৯০ সালে টাইব্রেকারে জার্মানির কাছে বা ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে অতিরিক্ত সময়ে হার—সবই যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে আটলান্টার এই রাতে। ইংল্যান্ড তারকা হ্যারি কেইন হারের পর হতাশ কণ্ঠে বিবিসিকে বলেন, “ম্যাচের সিংহভাগ সময় আমরা ভালো খেলেছি। কিন্তু ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছে আমরা শুধু লিডটা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলে শুধু এতটুকু দিয়ে পার পাওয়া যায় না।” তিনি আরও জানান যে, এই পর্যায়ে আসার জন্য তারা প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

টমাস টুখেলের কৌশল নিয়ে ইংল্যান্ডের ভেতরেই এখন নানা প্রশ্ন উঠছে। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সময় ইংল্যান্ড ৫-৪-১ ফরমেশনে খেলা শুরু করে। এতে তারা আর্জেন্টিনাকে উল্টো আক্রমণের আমন্ত্রণ জানায়। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা এই সুযোগ লুফে নিয়ে একের পর এক আক্রমণের ঢেউ আছড়ে ফেলে ইংলিশ বক্সে। বিশেষ করে রদ্রিগো দি পলের ক্রস থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড যখন পোস্টে লেগে ফিরে আসে, তখনই বোঝা যাচ্ছিল ইংল্যান্ডের বিপদ আসন্ন। শেষ পর্যন্ত ৮৫ মিনিটের পর ৫ মিনিটের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ। ইংলিশ সমর্থকদের জন্য এই হার ছিল সত্যিই অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক।

আর্জেন্টিনার এই জয় কেবল ফুটবলেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল আবেগ আর জেদের লড়াই। জয়ের পর মার্তিনেজদের হাতে থাকা ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার’ লেখা ব্যানার নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কোচ লিওনেল স্কালোনি গর্বের সাথে বলেন, তার দল আসলেও অনন্য এবং তারা টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছে। অন্যদিকে স্পেনের গতিময় ফুটবলের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা তাদের এই ছন্দ ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখন থেকেই চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। ফুটবল প্রেমীরা এখন উন্মুখ হয়ে আছেন এক ধ্রুপদী ফাইনাল দেখার জন্য।

শিরোপা জেতার জন্য আর্জেন্টিনার দরকার আর মাত্র একটি জয়। ফুটবল ইতিহাসে এমন রোমাঞ্চকর ফাইনাল খুব কমই দেখা গেছে। একদিকে ইয়ামাল-রদ্রিদের তারুণ্যদীপ্ত স্পেন, অন্যদিকে মেসি-মার্তিনেজদের অভিজ্ঞ আর্জেন্টিনা। পরিসংখ্যানে দুই দলই শক্তিশালী অবস্থানে আছে। তবে ফাইনালের মঞ্চে স্নায়ুর চাপ যারা সামলাতে পারবে, শেষ হাসি তারাই হাসবে। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত এখন তাকিয়ে আছেন সেই ঐতিহাসিক রোববারের দিকে। ফুটবল বিশ্বের এই দুই পরাশক্তির লড়াই শেষ পর্যন্ত কার হাতে সোনালী ট্রফি তুলে দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ