দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জট অবশেষে খুলতে যাচ্ছে। হাজার হাজার সহকারী শিক্ষকের জন্য এটি একটি দারুণ খুশির খবর। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আজ জাতীয় সংসদে ঘোষণা করেছেন যে, উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা রিট পিটিশন নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ায় এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। নরসিংদী-১ আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এই তথ্য নিশ্চিত করেন। এই ঘোষণার ফলে প্রাথমিক শিক্ষাখাতে দীর্ঘদিনের যে স্থবিরতা ছিল, তা কাটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি মামলা চলছিল। এই আইনি জটিলতার কারণে যোগ্য থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষক পদোন্নতি পাচ্ছিলেন না। সম্প্রতি এই মামলাটির নিষ্পত্তি হয়েছে, যা এই প্রক্রিয়ার প্রধান বাধা দূর করে দিয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক কাজগুলো গুছিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, “আমরা চাই না আমাদের শিক্ষকরা বছরের পর বছর একই পদে পড়ে থাকুক। তাদের যোগ্য সম্মান ও পদমর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য।” এই সংবাদ পাওয়ার পর সারা দেশের ৬৫,০০০ এর বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
এবারের পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় একটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে প্রধান শিক্ষক পদের মাত্র ৬৫% পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হতো এবং বাকি ৩৫% সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু নতুন নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, পদোন্নতির এই হার ১৫% বাড়িয়ে সরাসরি ৮০% করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখন প্রতি ১০০ জন প্রধান শিক্ষকের মধ্যে ৮০ জনই আসবেন সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে। বাকি ২০% পদ সরাসরি নিয়োগের জন্য রাখা হবে। এই সিদ্ধান্তকে শিক্ষকরা ১০০% ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন, কারণ এতে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কাজের মূল্যায়ন অনেক বাড়বে। তারা মনে করছেন, অভিজ্ঞ শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষক হলে বিদ্যালয়ের চেইন অফ কমান্ড অনেক শক্তিশালী হবে।
আ ন ম এহছানুল হক মিলন আরও ব্যাখ্যা করেন যে, সরকার অনেক আগেই নতুন নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন করেছিল। কিন্তু হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলার কারণে সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছিল না। পদোন্নতি না হওয়ায় অনেক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছিল, যা প্রশাসনিকভাবে বেশ ঝামেলার সৃষ্টি করত। এখন মামলার বাধা কেটে যাওয়ায় সরাসরি ৮০% কোটায় পদোন্নতি দেওয়ার পথ পরিষ্কার হয়েছে। এতে গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ এবং ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। শিক্ষকরাও এখন পূর্ণ উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারবেন কারণ তাদের সামনে ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার একটি নিশ্চিত পথ তৈরি হয়েছে।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে হলে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রাথমিক শিক্ষা হলো আমাদের শিক্ষার ভিত্তি। এই ভিত্তিকে মজবুত করতে হলে যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। তাই দ্রুত এই শূন্যপদগুলো পূরণ করা হবে। যারা ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন, তারা এই নতুন বিধিমালার সুবিধা সবচেয়ে বেশি পাবেন। তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি এই ৮০% কোটার মাধ্যমে যথাযথ সম্মান পাবে বলে বিশ্বাস করে সরকার।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে হাজার হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ খালি পড়ে আছে। পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু হলে এক ধাক্কায় অনেক বেকারত্ব দূর হবে না ঠিকই, কিন্তু কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে কাজের স্পৃহা অন্তত ২০০% বেড়ে যাবে। শিক্ষকরা বলছেন, পদোন্নতি না হওয়ায় তারা মানসিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে ছিলেন। এখন নতুন উদ্যমে তারা পাঠদানে মনোনিবেশ করতে পারবেন। সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রীর এই পরিষ্কার বার্তা শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কত দ্রুত এই ঘোষণাটি বাস্তবে রূপ নেয়।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পদোন্নতির জন্য ইতোমধ্যে জ্যেষ্ঠতার তালিকা (সিনিয়রিটি লিস্ট) হালনাগাদ করার কাজ শুরু হয়েছে। জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা স্বচ্ছতার সাথে শিক্ষকদের তালিকা তৈরি করে কেন্দ্রে পাঠায়। এতে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন আশা প্রকাশ করেন যে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের অধিকাংশ স্কুলে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। এটি বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
পরিশেষে, শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণা শিক্ষাখাতে নতুন গতির সঞ্চার করেছে। শুধু পদোন্নতি নয়, বরং শিক্ষার মান বাড়াতে সরকার অন্যান্য পদক্ষেপও নিচ্ছে। ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ বা বিসিএস পরীক্ষার জটিলতা নিরসনের মতো খবরগুলোর পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষকদের এই সুখবরটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করে, শিক্ষকদের জীবনমান উন্নত হলে তার সরাসরি সুফল পাবে দেশের শিশুরা। তাই এই ৮০% কোটার বাস্তবায়ন যেন দ্রুত এবং স্বচ্ছ হয়, এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।
















