মো. আল আমিন, দীঘিনালা:
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত রোববার মধ্যরাতে উপজেলার কবাখালী ইউনিয়নের মুসলিমপাড়া এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। এই অগ্নিকাণ্ডে দীঘিনালা উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. লোকমান হোসেনের মাথা গোঁজার শেষ সম্বল বসতঘরটি চোখের পলকে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনে বসতঘরটি পুরোপুরি ভস্মীভূত হওয়ায় এখন খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পুরো পরিবারটি।
ঘটনাটি ঘটে ১৩ জুলাই দিবাগত রাত ১২টার দিকে। যখন সারাদিনের ক্লান্তি শেষে গ্রামের মানুষজন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, ঠিক তখনই হঠাৎ আগুনের শিখা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যে তা পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা আগুনের লেলিহান শিখা দেখে চিৎকার শুরু করেন এবং দ্রুত পানি ও বালু দিয়ে আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তবে কাঠের ও টিনের ঘর হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। আগুনের তাপে আশেপাশের পরিবেশও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি দাবি করেছে যে, এই অগ্নিকাণ্ডে তাদের প্রায় ১০,০০,০০০ থেকে ১৫,০০,০০০ (দশ থেকে পনেরো লাখ) টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঘরের ভেতরে থাকা সব আসবাবপত্র, ফ্রিজ, টিভি থেকে শুরু করে মূল্যবান দলিলপত্র এবং জমানো নগদ টাকা সবই এখন কয়লায় পরিণত হয়েছে। লোকমান হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “জীবনের সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে আমি এই ঘরটি গুছিয়েছিলাম। মাত্র কয়েক মিনিটের আগুনে আমাদের ১০০% সম্পদ পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হতে পেরেছি, এছাড়া আর কিছুই রক্ষা করতে পারিনি।” এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এখন তাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।
আগুনের খবর পেয়ে দীঘিনালা ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পৌঁছানোর আগেই যদিও ঘরটির অধিকাংশ অংশ পুড়ে গিয়েছিল, তবুও তাদের কঠোর পরিশ্রম ও তৎপরতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এতে করে আশেপাশের অন্যান্য বাড়িঘর বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পায়। দীঘিনালা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার রুপক কান্তি সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তাদের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে তারা ধারণা করছেন, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন।
অগ্নিকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে সোমবার সকালে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। লোকমান হোসেন যেহেতু একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক, তাই তার এই বিপদে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং এলাকাবাসী ভিড় করেন। তারা এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় গভীর সমবেদনা জানান এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেন। স্থানীয়রা জানান, পাহাড়ি এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে পানির অভাব এবং যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। এই ঘটনায় তারা ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত উপস্থিতিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
বর্তমানে লোকমান হোসেন তার পরিবার নিয়ে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আগুনে তাদের পড়ার বই, জরুরি নথিপত্র এবং প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড়ও পুড়ে গেছে। পরিবারের ছোট সদস্যদের আর্তনাদে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এই বিপদের সময় স্থানীয় প্রশাসন, জেলা পরিষদ এবং বিত্তবানদের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। বিশেষ করে বর্তমান উচ্চমূল্যের বাজারে ঘরবাড়ি পুনরায় তৈরি করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল কেনা লোকমানের পরিবারের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণত গ্রামাঞ্চলে পুরনো বিদ্যুৎ লাইনের সমস্যা বা নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে শর্ট সার্কিটের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অগ্নিনির্বাপক দলের কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করলেও অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। এই ঘটনাটি আবারও সবাইকে সচেতন হওয়ার বার্তা দিয়ে গেল। বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিসের নম্বর সাথে রাখা কতটা জরুরি, তা এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
পরিশেষে, লোকমান হোসেনের সাজানো সংসারটি যেভাবে মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো, তা সত্যিই বেদনাদায়ক। তার পরিবার এখন তাকিয়ে আছে সমাজের মানবিক মানুষের সাহায্যের দিকে। আমরা আশা করি, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সহযোগিতায় তারা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন এবং আবার একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাবেন।
















