চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৫৩ বিজিবির সাঁড়াশি অভিযান: বিপুল পরিমাণ মরণনেশা এস্কাফ সিরাপ জব্দ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত এলাকা এখন চোরাকারবারিদের জন্য এক আতঙ্কের জনপদ হয়ে উঠেছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের নিয়মিত টহল ও মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে এবার বড় ধরনের একটি সাফল্য পেয়েছে। ৫৩ বিজিবির একটি বিশেষ দল গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় নিষিদ্ধ এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করেছে। ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখ রাত ২:০০ ঘটিকার দিকে এই অভিযানটি পরিচালনা করা হয়, যা সীমান্ত এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের একটি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই অভিযানে চোরাকারবারিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তাদের ফেলে যাওয়া মরণনেশা এখন বিজিবির হেফাজতে।

বিজিবি সূত্র থেকে জানা গেছে, গোপন সংবাদ ছিল যে একদল চোরাকারবারি ভারত থেকে বড় একটি মাদকের চালান নিয়ে শিবগঞ্জ থানার দুর্লভপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে দেশের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। এই খবর পাওয়ামাত্র ৫৩ বিজিবির অধীনে থাকা মনোহরপুর বিওপির একটি চৌকস দল দ্রুত প্রস্তুতি নেয়। তারা সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ওত পেতে থাকে। রাত যখন আনুমানিক ২টা, তখন বিজিবি সদস্যরা লক্ষ্য করেন কয়েকজন লোক মাথায় বস্তা নিয়ে অন্ধকার পথে দ্রুত হেঁটে আসছে। বিজিবি সদস্যরা তাদের চ্যালেঞ্জ করলে চোরাকারবারিরা মুহূর্তের মধ্যেই মাথায় থাকা বস্তা ফেলে পাশের ঝোপঝাড় এবং অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে বিজিবি সদস্যরা সেই স্থান তল্লাশি করে ১২৪ বোতল ভারতীয় নিষিদ্ধ এস্কাফ সিরাপ উদ্ধার করেন।

জব্দকৃত এই ১২৪ বোতল এস্কাফ সিরাপের বাজারমূল্য বর্তমান হিসেবে প্রায় ৪৯,৬০০/- (ঊনপঞ্চাশ হাজার ছয়শত) টাকা। তবে চোরাকারবারিদের হাত বদল হয়ে যখন এই মাদক খুচরা বিক্রেতা বা মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছায়, তখন এর দাম প্রায় ২০০% থেকে ৩০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এই এস্কাফ সিরাপ মূলত ফেনসিডিলের একটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা দেশের যুবসমাজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জব্দকৃত এই মাদকের চালানটি শিবগঞ্জ থানায় জমা দিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় বিজিবির এই কঠোর নজরদারির কারণে বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই এই অভিযান সফল হয়েছে।

শুধু এই একটি অভিযানই নয়, চলতি জুলাই মাসে ৫৩ বিজিবি সীমান্ত এলাকায় তাদের নজরদারি প্রায় ৮০% থেকে ৯০% বাড়িয়ে দিয়েছে। বিজিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ধারাবাহিক অভিযানে তারা অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছেন। পুরো মাসের অভিযানে এখন পর্যন্ত ১ জন মাদক পাচারকারীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে মোট ২৭১ বোতল এস্কাফ সিরাপ, ৬৪ বোতল নেশাজাতীয় ফেয়ারডিল সিরাপ এবং ৪৬ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার করা হয়েছে। জুলাই মাসের এই কয়েক দিনে উদ্ধার হওয়া মাদকের মোট আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ২,০৩,১০০/- (দুই লক্ষ তিন হাজার একশত) টাকা। বিজিবির এই কঠোর অবস্থানের ফলে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানের হার গত মাসের তুলনায় প্রায় ৩০% কমেছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদকের অনুপ্রবেশ রুখতে বিজিবির এই তৎপরতা প্রশংসনীয়। শিবগঞ্জ এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, “মাদকের কারণে আমাদের গ্রামের অন্তত ১৫% থেকে ২০% কিশোর ও যুবক বিপথে যাচ্ছে। বিজিবি যদি এভাবে প্রতিদিন অভিযান চালায়, তবে চোরাকারবারিরা আর সাহস পাবে না।” বিজিবি সদস্যরাও বলছেন, মাদক চোরাচালানের সাথে জড়িতদের প্রায় ৫০% এখন গা ঢাকা দিয়েছে। কারণ তারা জানে, ধরা পড়লে এবার আর কোনো ছাড় নেই। মাদকবিরোধী এই যুদ্ধে জয়ী হতে স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে বিজিবি ১০০% সহযোগিতা আশা করছে।

বিজিবির গোয়েন্দা শাখা সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত পেরিয়ে আসা এই এস্কাফ সিরাপগুলো মূলত ভারতের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়। চোরাকারবারিরা সাধারণত রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যবর্তী সময়টিকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে। কিন্তু বিজিবি এখন আধুনিক প্রযুক্তি এবং নাইট ভিশন ক্যামেরার সাহায্যে প্রায় ৬০% সীমান্ত এলাকা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখছে। বিশেষ করে মনোহরপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের মতো এলাকাগুলো যেখানে চোরাচালানের ঝুঁকি বেশি, সেখানে টহল দলের সংখ্যা আগের চেয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। ৫৩ বিজিবির এই তৎপরতায় সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে আসছে।

মাদকের মরণনেশা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে সরকার যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে, ৫৩ বিজিবি যেন তারই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাদকের এই মরণ ছোবল রুখতে তারা প্রয়োজনে আরও কঠোর হবেন। তাদের লক্ষ্য হলো সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের পথ ১০০% বন্ধ করে দেওয়া। জব্দকৃত মাদকের আর্থিক মূল্য যাই হোক না কেন, এর মাধ্যমে যে কয়েক শ তরুণের জীবন ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে গেল, সেটাই বিজিবির কাছে বড় অর্জন। শিবগঞ্জ থানায় জমা দেওয়া মাদকগুলো খুব শীঘ্রই আদালতের নির্দেশে জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

সবশেষে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৫৩ বিজিবি) অধিনায়ক জানিয়েছেন যে, সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ চলতেই থাকবে। কোনোভাবেই দেশের সীমানাকে অপরাধীদের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া হবে না। এলাকাবাসীকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের তথ্য দিলে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে। ৫৩ বিজিবির এই ধারাবাহিক সাফল্য পুরো জেলায় মাদকের সরবরাহ চেইন ভেঙে দিতে সক্ষম হবে বলে সুশীল সমাজ আশা প্রকাশ করছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ