রাজাপুরে মাদক কারবারি স্বামী ও দুই স্ত্রী শ্রীঘরে: ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এলাকা জুড়ে স্বস্তি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝালকাঠির রাজাপুরে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে বড় ধরনের একটি অভিযান চালিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। গত রবিবার সন্ধ্যায় উপজেলার গালুয়া ইউনিয়নের কানুদাসকাঠি এলাকায় এক ঝটিকা অভিযানে একই পরিবারের তিন মাদক কারবারিকে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। স্বামী এবং তার দুই স্ত্রীকে একসঙ্গে সাজা দেওয়ার এই ঘটনা এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মাদক ব্যবসার আসর গুঁড়িয়ে দিয়ে প্রশাসন যেন সাধারণ মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

অভিযানটি পরিচালনা করেন রাজাপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক মো. শামিম রেজা সজিব। প্রশাসনের কাছে গোপন খবর ছিল যে, কানুদাসকাঠি এলাকার একটি বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে মরণনেশা ইয়াবার রমরমা ব্যবসা চলছে। এই খবরের ভিত্তিতে ওই এলাকায় ওত পেতে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রবিবার সন্ধ্যায় সুযোগ বুঝে মাদক সম্রাট মো. কালাম সরদারের বাড়িতে হানা দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে কালাম সরদারের ঘর তল্লাশি করে মোট ১৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। হাতেনাতে প্রমাণ মেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থা করা হয়।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন কানুদাসকাঠি এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী মো. কালাম সরদার এবং তার দুই স্ত্রী মোসা. শিউলি বেগম ও মোসা. রুপিয়া বেগম। বিচারে অপরাধ স্বীকার করায় এবং তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিচারক কালাম সরদারকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। অন্যদিকে, মাদক ব্যবসায় স্বামীকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করার অপরাধে তার দুই স্ত্রী রুপিয়া ও শিউলি বেগমকে ৩ মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাজা ঘোষণার পর পরই কড়া নিরাপত্তায় তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদকের বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। তাদের বাড়ির আশেপাশে উঠতি বয়সী তরুণদের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। কানুদাসকাঠি ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় ৮০% মানুষের অভিযোগ ছিল এই পরিবারের বিরুদ্ধে। কিন্তু লোকলজ্জা আর বিপদের ভয়ে কেউ সরাসরি মুখ খোলার সাহস পেতেন না। কালাম সরদারের এই মাদক সাম্রাজ্যের কারণে স্থানীয় যুবসমাজের অন্তত ৪০% থেকে ৫০% মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে ছিল। আজকের এই অভিযানের ফলে গ্রামবাসী ১০০% স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং তারা আশা করছেন এর মাধ্যমে এলাকায় মাদকের প্রকোপ অনেকটাই কমে আসবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ অনুযায়ী এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। বিচারক মো. শামিম রেজা সজিব জানান, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে এই ধরনের অভিযান নিয়মিত চলবে। তিনি আরও বলেন, মাদক শুধু একটি পরিবারকে ধ্বংস করে না, এটি একটি পুরো সমাজ ও অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মাদক সংক্রান্ত অপরাধের হার যদি ১০% কমানো যায়, তবে অপরাধের সামগ্রিক হার অন্তত ২৫% কমে আসবে। তাই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা মাদক কারবারিদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।

গ্রামের বয়স্করা জানান, কানুদাসকাঠি এক সময় অত্যন্ত শান্ত একটি এলাকা ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে মাদকের প্রভাবে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে কিশোর ও যুবকরা ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি থেকে শুরু করে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কালাম সরদারের মতো অপরাধীরা অল্প সময়ে অনেক টাকা উপার্জনের লোভে এই মরণনেশা ইয়াবার ব্যবসায় নামে। অভিযানে উদ্ধারকৃত ১৩ পিস ইয়াবার বাজারমূল্য খুব বেশি না হলেও, এই ব্যবসার নেপথ্যে থাকা দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়াটাই ছিল প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।

রাজাপুরের সচেতন সমাজ মনে করে, শুধু জেল-জরিমানা দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা। মাদকের কারণে গ্রাম বাংলার শান্তি যেভাবে নষ্ট হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষ এখন দিশেহারা। পুলিশ ও প্রশাসনের তথ্যমতে, এই উপজেলায় গত এক বছরে মাদক বিরোধী অভিযানের সংখ্যা আগের চেয়ে প্রায় ১৫% বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে অনেক বড় বড় মাদক ডিলার এখন এলাকা ছাড়া। তবে খুচরা বিক্রেতা ও কালাম সরদারের মতো পারিবারিক মাদক ব্যবসায়ীরা এখনও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবশেষে, এই সফল অভিযানের পর রাজাপুর থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন গালুয়া ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষ। তারা চান, শুধু কানুদাসকাঠি নয়, উপজেলার প্রতিটি কোণ যেন মাদকমুক্ত হয়। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে যে, তথ্যদাতার নাম গোপন রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই এক অভিযানের মাধ্যমে কালাম ও তার দুই স্ত্রীর জেল হওয়াটা অন্য মাদক কারবারিদের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ