জলাবদ্ধতায় ডুবছে ভবানীপুর বাজার: ড্রেনেজ সংকটে ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত, জনদুর্ভোগ চরমে

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র ভবানীপুর বাজার এখন যেন এক অভিশাপের নাম। সামান্য বৃষ্টি হলেই এই বাজারের রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যায়। ৩ নং তাহেরহুদা ইউনিয়নে অবস্থিত এই বাজারে দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সংস্কারের অভাবে সামান্য বর্ষাতেই দেখা দিচ্ছে চরম জলাবদ্ধতা। এতে করে বাজারের প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন ব্যবসায়ী এবং প্রতিদিন আসা কয়েক হাজার সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। বৃষ্টির পানি জমে থাকায় বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে এবং জনদুর্ভোগ এখন আকাশচুম্বী।

সরেজমিনে বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। বৃষ্টির পর বাজারের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে গলিগুলোর অবস্থা এখন বেহাল। কোথাও হাঁটু সমান পানি, আবার কোথাও কাদা-পানির মিশ্রণে একাকার হয়ে আছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বৃষ্টি থামার পরও প্রায় ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত এই পানি নামে না। পানি বের হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট পথ না থাকায় এই জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। বাজারের ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা প্রায় ৯০ শতাংশ হারিয়ে ফেলেছে। ফলে সামান্য আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতেই পুরো বাজার এলাকা ১ থেকে ২ ফুট পানির নিচে চলে যায়।

বাজারের একজন ক্ষুদ্র কাপড় ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, বৃষ্টির কারণে গত এক সপ্তাহে আমাদের বেচাকেনা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। কাদা আর নোংরা পানি মাড়িয়ে কোনো ক্রেতা দোকানে আসতে চান না। সারা দিনে যেখানে ১০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হতো, সেখানে এখন ২ হাজার টাকা বিক্রি করতেই কষ্ট হচ্ছে। বাজারের এই করুণ দশা আমাদের ব্যবসায়িক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। শুধু এই ব্যবসায়ী নন, বাজারের মুদি দোকানদার থেকে শুরু করে কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরাও একই অভিযোগ করছেন। পচনশীল অনেক পণ্য পানির কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতি প্রতি মাসে গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা।

পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের সঠিক তদারকি না থাকায় ড্রেনগুলো এখন মশার প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জমে থাকা এই নোংরা পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা বাজারের পরিবেশকে চরম অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে। পথচারীরা জানান, এই ময়লা পানি ডিঙিয়ে চলতে গিয়ে অনেকের পায়ে চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের চলাচলে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দিনে কাদার মধ্যে পিছলে পড়ে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বাজারের আশপাশে প্রায় ৫ থেকে ৭টি গ্রামের মানুষ প্রতিদিন এই পথ ব্যবহার করেন, যাদের ভোগান্তির কোনো শেষ নেই।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য আমরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা শুধু আশ্বাসের বাণী শুনিয়ে যাচ্ছেন। ড্রেনের কাঠামো গত ১০ বছরেও কোনো বড় ধরনের সংস্কার পায়নি। বাজারের পানি যাওয়ার একমাত্র নালাটি এখন পলি মাটি আর প্লাস্টিক বর্জ্যে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। যদি এখনই একটি আধুনিক এবং প্রশস্ত ড্রেন নির্মাণ না করা হয়, তবে সামনের বর্ষা মৌসুমে পুরো বাজারটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। বাজারের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ এখন স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন।

এই চরম দুর্ভোগের কথা জানিয়ে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীরা হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রদীপ রায় দীপন-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তারা চান, প্রশাসন দ্রুত সরেজমিনে এসে বাজারের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করুক। এলাকাবাসীর দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, বরং বাজেটে বরাদ্দ রেখে অন্তত ১ থেকে ২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কার্যকর ড্রেন নির্মাণ করা হোক। এতে করে বৃষ্টির পানি দ্রুত পাশের খালে বা নিচু জমিতে গিয়ে পড়তে পারবে। বাজার কমিটির সদস্যরাও বলছেন, সরকারি উদ্যোগে ড্রেন পরিষ্কার এবং নতুন ড্রেন তৈরি করলে এই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, তারা নিয়মিত সরকারকে কর ও খাজনা দেন, কিন্তু নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দিক দিয়ে তারা অনেক পিছিয়ে আছেন। ভবানীপুর বাজারের উন্নয়নের জন্য যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবসায়ী ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে পড়ছেন কারণ তাদের নিয়মিত আয় বন্ধ হওয়ার পথে। এলাকার সাধারণ মানুষের একটাই দাবি—বৃষ্টির পানি যেন জীবনকে থমকে না দেয়।

সব মিলিয়ে ভবানীপুর বাজারের জলাবদ্ধতা এখন এই অঞ্চলের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়রা বুকভরা আশা নিয়ে প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তারা বিশ্বাস করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই জনদুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। একটি পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাই পারে ভবানীপুর বাজারের হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে এবং হাজার হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করতে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ