দেশের উত্তরবঙ্গ মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল একটি অঞ্চল। এই এলাকার কৃষকদের জীবনমান উন্নত করতে এবং কৃষিকে একটি আধুনিক ও লাভজনক শিল্পে রূপান্তর করতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে একটি কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল পুনঃ অর্থায়ন তহবিল বা ফান্ড গঠন করা হয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসাবে এই তহবিলের পরিমাণ প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার ($) এর কাছাকাছি। কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বিকাশের মাধ্যমে গ্রামে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এই বিশেষ ঋণ কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র থেকে জানা যায়, এই বিশেষ তহবিল থেকে ঋণ নিতে গেলে সাধারণ গ্রাহক বা কৃষকদের ৯% হারে সুদ দিতে হবে। বর্তমান বাজারে সাধারণ ঋণের সুদহারের চেয়ে এটি বেশ কম ও সাশ্রয়ী। অন্যদিকে, যেসব ব্যাংক কৃষকদের এই ঋণ দেবে, তারা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মাত্র ৪% সুদে এই তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে। মাঝখানের ৫% লাভ ব্যাংকগুলো তাদের প্রশাসনিক খরচ ও মুনাফা হিসেবে রাখতে পারবে। এতে করে ব্যাংকগুলোও কৃষকদের ঋণ দিতে অনেক বেশি উৎসাহিত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে উত্তরবঙ্গের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সেখানে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষায়িত হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজের চরম অভাব এবং পর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের প্রায় ২০% থেকে ৩০% মাঠেই নষ্ট হয়ে যায়। এই বাধাগুলো পুরোপুরি দূর করে কৃষির সম্পূর্ণ মূল্য শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানি বাড়াতেই মূলত এই বিশাল ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে।
এই ঋণের সুবিধা কারা পাবেন, সে বিষয়টিও বাংলাদেশ ব্যাংক খুব পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে। এই তহবিলের সুবিধা পাবেন মূলত রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলাগুলোর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। কৃষকেরা এককভাবে বা দলবদ্ধভাবে ফসল উৎপাদন, মাছ চাষ এবং গবাদিপশু পালনের জন্য এই তহবিল থেকে খুব সহজেই ঋণ নিতে পারবেন। কৃষিভিত্তিক কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বা সিএমএসএমই (CMSME) খাতের ব্যবসায়ীরা নতুন প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের জন্যও এই তহবিল থেকে সুবিধা পাবেন। এছাড়া নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের অর্থায়ন সহজ করতে জমির দলিলের পরিবর্তে সামাজিক বা দলগত জামানতের ভিত্তিতেও ঋণের দারুণ সুযোগ রাখা হয়েছে।
বণ্টনের সুবিধার্থে পুরো ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিলকে প্রধান ৪টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি কৃষি উৎপাদন খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে মোট তহবিলের ১৫% অর্থ। উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও অবকাঠামো তৈরির খাতের জন্য সবচেয়ে বেশি ৩৫% বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একইভাবে কৃষিভিত্তিক পণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আরও ৩৫% অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আর বাকি ১৫% অর্থ রাখা হয়েছে কৃষিপণ্য রপ্তানি খাতের জন্য, যাতে করে আমাদের দেশের কৃষিপণ্য বিদেশে বিক্রি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার ($) আয় করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের একটি নির্দিষ্ট সীমাও বেঁধে দিয়েছে। কৃষি উৎপাদন খাতে একজন কৃষককে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও অবকাঠামো খাতের বড় উন্নয়নের জন্য সর্বোচ্চ ঋণসীমা ধরা হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। কৃষিভিত্তিক পণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের জন্যও ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে। আর কৃষিপণ্য রপ্তানি খাতের জন্য সর্বোচ্চ ঋণসীমা রাখা হয়েছে ১৫ কোটি টাকা। তবে বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকগুলো চাইলে এই ঋণের সীমা ২০% পর্যন্ত বাড়াতে বা কমাতে পারবে।
ঋণ পরিশোধের মেয়াদের ক্ষেত্রেও কৃষকদের বেশ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদন খাতের ঋণের মেয়াদ ধরা হয়েছে সর্বোচ্চ ১৮ মাস, যার মধ্যে ৩ মাসের গ্রেস পিরিয়ড বা অতিরিক্ত সময় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আর অন্যান্য খাত যেমন—সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির জন্য ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ৩৬ মাস বা ৩ বছর। এর মধ্যে ৩ থেকে ৬ মাসের গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই তহবিলের অর্থ শুধু ‘নতুন ঋণ’ হিসেবেই বিতরণ করতে হবে। কোনোভাবেই পুরোনো ঋণ শোধ বা খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার জন্য এই তহবিলের এক টাকাও ব্যবহার করা যাবে না। খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবেন না। আগ্রহী গ্রাহকদের এই সুবিধা নিতে তাদের নিকটস্থ ব্যাংকের শাখা, উপশাখা বা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।














