বাংলাদেশ পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের একটি রদবদল ও শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছে সরকার। বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ৩৩ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে তাদের চাকরি থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসরে পাঠানো হয়েছে। আজ রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনে এই বড় সিদ্ধান্তের কথা সাধারণ মানুষকে জানানো হয়। এই কর্মকর্তাদের সবাই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশের বিভিন্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো এই ৩৩ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৪ জন হলেন পুলিশের উপমহাপরিদর্শক বা ডিআইজি পদমর্যাদার। এছাড়া ১৮ জন রয়েছেন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং ১ জন পুলিশ সুপার বা এসপি। গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই কর্মকর্তাদের আগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত হিসেবে রাখা হয়েছিল। এদের মধ্যে অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে এই ৩৩ জনের মধ্যে দুজন কর্মকর্তা ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে আছেন এবং অনেকেই গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে বা পলাতক রয়েছেন।
অবসরে পাঠানো ১৪ জন ডিআইজির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলো হলো—মোল্যা নজরুল ইসলাম এবং মো. সাইফুল ইসলাম, যারা দুজনই বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় আছেন। এছাড়া তালিকায় রয়েছেন মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ, শাহ মিজান শাফিয়ার রহমান, এস এম মোস্তাক আহমেদ খান, জিহাদুল কবির, মঈনুল হক, মো. ইলিয়াছ শরীফ, শ্যামল কুমার নাথ, মো. জাকির হোসেন খান, মো. শাহ আবিদ হোসেন, মো. জামিল হাসান, মো. মাহবুবুর রহমান এবং মো. মনিরুজ্জামান। এই কর্মকর্তারা বিগত সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং পুলিশের নীতিনির্ধারণী অনেক কাজে তাদের ১০০% সরাসরি প্রভাব ছিল বলে জানা যায়।
অন্যদিকে, যে ১৮ জন অতিরিক্ত ডিআইজিকে অবসরে পাঠানো হয়েছে, তারা হলেন—মো. বরকতুল্লাহ খান, এ টি এম মোজাহিদুল ইসলাম, মো. আনোয়ার হোসেন খান, মোহা. মনিরুজ্জামান, মো. মেহেদুল করিম, মো. আলমগীর কবীর, মো. রশীদুল হাসান, সঞ্জয় কুমার কুণ্ডু, মো. নিজামুল হক মোল্যা, এস এম এমরান হোসেন, মুহাম্মদ সাইদুর রহমান খান, ড. শামসুন্নাহার, মোল্লা জাহাঙ্গীর হোসেন, সাইফুল্লাহ আল মামুন, খান মুহাম্মদ রেজোয়ান, মো. সাজিদ হোসেন, শেখ রফিকুল ইসলাম এবং মাশরুকুর রহমান খালেদ। আর এই তালিকায় থাকা একমাত্র পুলিশ সুপার বা এসপি হলেন আবদুল্লাহ আরেফ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলেও এই কর্মকর্তারা সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী তাদের অবসরজনিত সব ধরনের আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন। সাধারণত একজন ডিআইজি বা অতিরিক্ত ডিআইজি অবসরে গেলে তারা পেনশন, গ্র্যাচুইটিসহ লাখ লাখ টাকা বা কয়েক হাজার ডলার ($) সমপরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। তবে যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে বা যারা গ্রেপ্তার আছেন, তাদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত হয়তো কিছু সুবিধা আটকে থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং জনবান্ধব করে গড়ে তোলার জন্য একটি বড় ধরনের সংস্কার বা শুদ্ধি অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের অংশ হিসেবে এর আগেও পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। আজকের এই ৩৩ জনের তালিকা সেই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ। সাধারণ মানুষ সরকারের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা আশা করেন, এর ফলে পুলিশ বাহিনীতে পেশাদারত্ব ফিরে আসবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাবে।














