ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গুলিতে মার্কিন পাইলট নিহত

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ইন্দোনেশিয়ার অশান্ত পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পাপুয়ায় একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহীদের গুলিতে একজন মার্কিন পাইলট নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনী অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ইতিমধ্যে তার মরদেহ উদ্ধার করেছে। আজ শুক্রবার ইন্দোনেশীয় সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করে জানায় যে, এই হামলাটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়া সরকারের জন্য একটি কড়া সতর্কবার্তা।

ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া দ্বীপটি প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কিন্তু এই দ্বীপের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ইন্দোনেশিয়া থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য সশস্ত্র লড়াই করে আসছেন। সম্প্রতি এই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে বেশ কিছু উন্নত ও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এসে পড়ায় তাদের হামলার মাত্রা আগের চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক ও ঘন ঘন হয়ে উঠেছে। এই অঞ্চলের পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সেখানে প্রায় ১০০% অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ওয়েস্ট পাপুয়া ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (টিপিএনপিবি) মুখপাত্র সেবি সামবম গতকাল বৃহস্পতিবার এই হামলার দায় স্বীকার করে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি জানান, তাঁদের সশস্ত্র সদস্যরা মার্কিন পাইলট নিকোলাস এফ গোসেলিনকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছেন। ঘটনাটি ঘটে হাইল্যান্ড পাপুয়া প্রদেশের ইয়াহুকিমো অঞ্চলে। মার্কিন পাইলট সেখানে তার উড়োজাহাজটি অবতরণ করার পরপরই বিদ্রোহীরা তাকে গুলি করে এবং পরে উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। একটি সাধারণ যাত্রীবাহী উড়োজাহাজকে এভাবে ধ্বংস করার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

সেবি সামবম তার বিবৃতিতে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, ওই উড়োজাহাজটি বারবার ইন্দোনেশীয় সেনাসদস্যদের বিভিন্ন গোপন স্থানে পৌঁছে দিচ্ছিল, যা টিপিএনপিবির জারি করা আলটিমেটামের সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইন্দোনেশিয়া সরকার যদি বেসামরিক উড়োজাহাজগুলোকে পাপুয়ার বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত ‘রেড জোনে’ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া এখনই বন্ধ না করে, তবে আগামী দিনে এমন আরও ভয়াবহ হামলা চালানো হবে।

বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীটির এই মুখপাত্র আরও বলেন, ইন্দোনেশীয় সামরিক বাহিনী ও ওয়েস্ট পাপুয়া ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির মধ্যকার সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সেই ব্যর্থতার দায় মনে করিয়ে দিতেই মূলত এ হামলা চালানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া ও মার্কিন সরকারকে একটি পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, তারা চাইলে যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় আঘাত হানতে পারে।

আজ পাপুয়ার সামরিক মুখপাত্র উইরিয়া আরতাদিগুনা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর এই বর্বরোচিত হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মার্কিন পাইলটের মরদেহ সফলভাবে উদ্ধার করে একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সামরিক বাহিনী এখন হামলাকারীদের খোঁজে ওই এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি শুরু করেছে। এর পাশাপাশি ওই ফ্লাইটে থাকা অন্যান্য যাত্রীদেরও সন্ধান করা হচ্ছে। এর আগে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, উড়োজাহাজটিতে পাইলট ছাড়া আরও সাতজন সাধারণ যাত্রী ছিলেন। তাঁরা সবাই পাপুয়ার স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের পরিণতি কী হয়েছে, তা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

জাকার্তায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি। তবে টিপিএনপিবির সরবরাহ করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, বন্দুক ও কুঠারে সজ্জিত সশস্ত্র বিদ্রোহীরা স্বাধীনতার প্রতীক ‘মর্নিং স্টার’ পতাকা তুলছেন এবং অত্যন্ত উল্লাসের সাথে ওই হামলার বিষয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন।

জানা গেছে, পুড়ে যাওয়া উড়োজাহাজটি ‘পিটি এএমএ’ নামে একটি স্থানীয় এয়ারলাইন সংস্থার মালিকানাধীন। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, তাদের ছোট ছোট উড়োজাহাজগুলো পাপুয়ার অত্যন্ত দুর্গম গ্রামগুলোতে খাবার, জ্বালানি ও চিঠি বহন করার মতো জরুরি কাজ করে থাকে। তবে মার্কিন পাইলট নিহত হওয়া ও উড়োজাহাজ জ্বালিয়ে দেওয়ার বিষয়ে পিটি এএমএ কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।

পাপুয়ায় বিদেশি পাইলটদের ওপর হামলার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাপুয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদীরা নিউজিল্যান্ডের পাইলট ফিলিপ মের্টেনসকে অপহরণ করেছিল। পাপুয়ার দুর্গম পার্বত্য এলাকা উদুগায় একটি ছোট বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ অবতরণের পর তাঁকে জিম্মি করা হয়েছিল। দীর্ঘ দেড় বছর পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে পাপুয়ার আকাশসীমা এখন কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ