পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড দিয়োগো জোতার মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা মনে পড়লে এখনো ফুটবল ভক্তদের হৃদয় কেঁপে ওঠে। মনে হয় এই তো সেদিনের কথা, অথচ চোখের পলকে এক বছর পার হয়ে গেল! আর কী অদ্ভুত এক কাকতালীয় ব্যাপার, গাড়ি দুর্ঘটনায় জোতার মৃত্যুর ঠিক এক বছর পূর্তির দিনেই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মাঠে নামল পর্তুগাল। এই ম্যাচে তো জোতারও মাঠে থাকার কথা ছিল। শারীরিকভাবে তিনি হয়তো নেই, তবে পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ ও পুরো দলের হৃদয়ে তিনি ঠিকই আছেন।
বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণার সময় পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ এক আবেগময় ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পর্তুগালের স্কোয়াডের সদস্যসংখ্যা ‘২৬+১’। অর্থাৎ ২৬ জন খেলোয়াড়ের সাথে অদৃশ্যভাবে জোতাও এই দলের অংশ। মার্তিনেজের চোখে জোতা হলেন পর্তুগাল দলের এক উজ্জ্বল ‘আলো’।
কানাডার টরন্টোতে জোতার সেই ‘আলো’ হয়ে যাওয়ার বছর পূর্তির দিনেই বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় বা প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে পর্তুগাল। শেষ ৩২ দলের রাউন্ডের এক মহানাটকীয় ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়েছে মার্তিনেজের শিষ্যরা। এই ম্যাচটি শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ সময় ৩ জুলাই ভোর ৫টায়। যদিও কানাডায় তখন স্থানীয় সময় ছিল ২ জুলাই, কিন্তু পর্তুগালে তখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ৩ জুলাই। গত বছরের এই ৩ জুলাই তারিখে মাত্র ২৮ বছর বয়সে ভাই আন্দ্রে সিলভাকে নিয়ে উত্তর-পশ্চিম স্পেনের একটি সড়কে ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন জোতা। দুই ভাই-ই সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
জোতার মৃত্যুর প্রথম বছর পূর্তির দিনেই পর্তুগালের এমন নাটকীয় জয় এবং বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ওঠাকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ‘জীবনের অদ্ভুত কাকতাল’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করে পর্তুগালকে প্রথম লিড এনে দিয়েছিলেন রোনালদো। ম্যাচ শেষে ফক্স স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “জীবনের কী অদ্ভুত এক কাকতাল, ভাবলেই অবিশ্বাস্য মনে হয়! ম্যাচের আগেই আমরা সবাই এই দিনটির কথা জানতাম। পুরো দলের জন্যই এটি একটি অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্ত ছিল। আজ মাঠে নামার আগে ড্রেসিংরুমে দলের সবাই মিলে আমরা এই কাকতালীয় বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। সত্যিই এটি অবিশ্বাস্য।”
ম্যাচ শেষে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। জোতার স্মৃতি জড়িয়ে থাকা ২১ নম্বর জার্সিটি গায়ে জড়িয়েই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন রোনালদো। কথা বলার একপর্যায়ে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে আঙুল তুলে কিছু একটা ইশারা করেন, যা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন দূর আকাশে থাকা জোতাকেই জয় উৎসর্গ করছেন। ৪১ বছর বয়সী এই জীবন্ত কিংবদন্তি আরও বলেন, “আমি সত্যিই আবেগাপ্লুত ও অভিভূত। আজকের এই মুহূর্ত আমাদের কাছে অনেক বড় কিছু। শুধু ম্যাচটি জিতেছি বলেই নয়, যেভাবে মহানাটকীয়ভাবে জয়টি আমাদের হাতে এসেছে, সেটিও দারুণ।”
সেই দারুণ ও স্মরণীয় জয়ে জোতা যে তাদের দলের সঙ্গেই ছিলেন, সেই গভীর বিশ্বাসের কথাও বলেছেন রোনালদো। পর্তুগালের স্থানীয় ‘স্পোর্ট টিভি’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “সে (জোতা) শারীরিকভাবে না থাকলেও আত্মিকভাবে আমাদের মাঝেই আছে। তাকে সবচেয়ে ভালোভাবে সম্মান জানাতে আজকের এই জয়টি আমাদের বড্ড দরকার ছিল। আমরা তার জন্যই মাঠে নিজেদের ১০০% উজাড় করে দিয়েছি।”
পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজও মনে করেন, এই জয়ের একটি বিশেষ ও গভীর তাৎপর্য আছে। মার্তিনেজের ভাষায়, “পর্তুগিজ সমর্থকদের জন্য আজ অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন। শুধু শেষ ষোলোতে উঠেছি বলেই নয়; বরং এই ম্যাচের অন্য একটি ভিন্ন অর্থ আছে। যে বছরটিতে আমরা আমাদের প্রিয় দিয়োগো জোতাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি, ঠিক সেই বছরের এই বিশেষ দিনেই আমাদের এই জয় এল।” উল্লেখ্য, এবারের বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের প্রথম ম্যাচের আগে হিউস্টনের স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে জোতার একটি সাদা-কালো ছবি প্রদর্শন করে তাঁকে বিনম্রভাবে স্মরণ করা হয়েছিল।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে এখন পর্তুগালের সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা। টেক্সাসের আর্লিংটনে আগামী সোমবার রাতে শেষ ষোলোর এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে শক্তিশালী স্পেনের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল। জোতার স্মৃতি বুকে ধারণ করে রোনালদোরা কি পারবেন স্পেনের বাধা টপকাতে? সেটাই এখন দেখার বিষয়।














