বিশ্ব রাজনীতিতে এখন বেশ উত্তাল সময় পার করছে বাংলাদেশ। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে নানা মহলে অনেক দিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ঠিক এমন একটি সময়ে বাংলাদেশের পাশে থাকার এক জোরালো বার্তা দিল চীন। ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, চীন যেকোনো দেশে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কেউ হস্তক্ষেপ করতে চাইলে, তার বিরোধিতা করতে চীন সব সময় বাংলাদেশের পাশে ১০০% অবস্থান করবে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বারিধারায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসে আয়োজিত এক বিশেষ মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন। মূলত বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফল চীন সফরকে কেন্দ্র করেই চীনা দূতাবাস এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি চীন সফর করে এসেছেন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সফরের পর দুই দেশের পক্ষ থেকে একটি যৌথ ইশতেহার বা বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। সেই ইশতেহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইন ছিল, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ চীন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করবে।’
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা রাষ্ট্রদূতের কাছে এই লাইনটির আসল অর্থ বা ব্যাখ্যা জানতে চান। এর জবাবে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন খুব খোলামেলাভাবেই কথা বলেন। তিনি বলেন, “শুধু বাংলাদেশ নয়, চীনের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তিই হলো আমরা যেকোনো দেশে অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। চীন নিজেও মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। অনেক বিদেশি অপশক্তি বা রাষ্ট্র বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায়। এমনকি এখনো আমরা কিছু নির্দিষ্ট মহলের দ্বারা একই ধরনের অপচেষ্টার সম্মুখীন হচ্ছি, যা আপনারা আন্তর্জাতিক খবরে নিয়মিত দেখেন।”
তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে চীনের গভীর উপলব্ধির কথা তুলে ধরেন। ইয়াও ওয়েন বলেন, “আপনাদের এটি বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশ বর্তমানে যে ধরনের কূটনৈতিক চাপ বা পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, তা আমরা পুরোপুরি বুঝতে ও অনুভব করতে পারি। কাজেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও সরকারের কাছে এই বার্তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যে, যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে চীন সব সময় বাংলাদেশের পাশে আছে। গত প্রায় ৫০ বছর ধরে এটাই আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি।”
প্রধানমন্ত্রীর এই বেইজিং সফরকে ঘিরে দেশের ভেতরে ও বাইরে আরেকটি বড় খবর বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, বাংলাদেশ নিজেদের বিমানবাহিনীকে আধুনিক করতে চীন থেকে অত্যাধুনিক ‘জে-১০সি’ (J-10C) মডেলের বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান কিনতে পারে। প্রতিটি জে-১০সি যুদ্ধবিমানের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ৪০ মিলিয়ন থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার ($) বা প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা হয়ে থাকে। তবে এই বিশাল সামরিক কেনাকাটার বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সরাসরি কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।
তবে তিনি সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। চীনের রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া যৌথ ইশতেহারে উভয় দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা, সফর বিনিময় এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ। এছাড়া জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ ও চীনের সেনাবাহিনী কীভাবে আরও ভালোভাবে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগ বজায় রেখে কাজ করতে পারে, সে বিষয়েও মতৈক্য হয়েছে।
যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে তিনি বেশ কৌশলী উত্তর দিয়ে বলেন, “আমি যেভাবে বলেছি, দুই দেশের মধ্যে আমাদের সহযোগিতা খুবই সমন্বিত ও বিস্তৃত। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা তারই একটি বড় অংশ। তবে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক কেনাকাটা বা চুক্তির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার মতো অবস্থানে আমি এই মুহূর্তে নেই। সুতরাং, এই যুদ্ধবিমান নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন যে নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা সামনের দিনে আরও ১০০% বাড়বে।














