শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ হলো উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষা। এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই মূলত একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের পথ বা ক্যারিয়ার তৈরি হয়। তাই এই পরীক্ষাগুলো সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করাটা প্রশাসন ও শিক্ষক উভয়ের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা প্রশাসন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইতিমধ্যে তাদের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আগামী ২০২৬ সালের এইচএসসি, আলিম এবং এইচএসসি (বিএম) বা ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা পরীক্ষা যাতে ১০০% সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়, সে লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (২৩ জুন) বিকেল ঠিক ৩টায় শৈলকুপা উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে এই গুরুত্বপূর্ণ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলার সুযোগ্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমান। এই সভায় উপজেলার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কলেজ, মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উপস্থিত ছিলেন। সভার শুরুতেই গত বছরের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে কী কী সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ ছিল, তা নিয়ে খোলামেলা পর্যালোচনা করা হয়। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পাঠানো পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত সর্বশেষ নীতিমালা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সভায় পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কেন্দ্র সচিব, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, শিক্ষক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও করণীয় খুব পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার শৈলকুপা উপজেলায় মোট ৮টি পরীক্ষা কেন্দ্রে এইচএসসি, আলিম ও এইচএসসি (বিএম) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এই ৮টি কেন্দ্রে এবার মোট ৩ হাজার ৬৭৫ জন শিক্ষার্থী তাদের মেধার পরীক্ষা দেবেন। কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী রয়েছে শৈলকুপা সরকারি ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে, যেখানে ১,০৬৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেবেন।
এছাড়া গাড়াগঞ্জ মির্জা জিয়াউর আলম ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে ৬৮০ জন, শৈলকুপা সিটি কলেজ কেন্দ্রে ৭০৮ জন, মানিকিয়া আদিল উদ্দিন কলেজ কেন্দ্রে ১০০ জন, জরিপ বিশ্বাস ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে ১৭৫ জন এবং শেখপাড়া দুঃখী মাহমুদ ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে ৪৫৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেবেন। মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে শৈলকুপা হাফিজ মাদ্রাসা কেন্দ্রে ১২৪ জন এবং কাতলাগাড়ী কলেজ (এইচএসসি বিএম) কেন্দ্রে ৩৬৯ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় বসবেন। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পরীক্ষা একসাথে নেওয়াটা একটি বড় কর্মযজ্ঞ।
আমাদের দেশে পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস বা নকলের মতো ঘটনা অনেক সময় বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেয়। একটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। তাই সভায় ইউএনও মো. মাহফুজুর রহমান পরীক্ষা চলাকালে প্রশ্নপত্রের ১০০% গোপনীয়তা রক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন। তিনি কেন্দ্র সচিবদের সতর্ক করে বলেন, প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খোলার সময় যেন বোর্ডের সব নিয়ম কঠোরভাবে মানা হয়। কেন্দ্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কোনো বহিরাগত বা দালাল যেন পরীক্ষা কেন্দ্রের ত্রিসীমানায় প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গ্রীষ্মের এই প্রচণ্ড গরমে পরীক্ষা চলাকালে যাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিক্ষার্থীদের কোনো কষ্ট না হয়, সে জন্য বিদ্যুৎ বিভাগকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আলো, বাতাস, পরিষ্কার বাথরুম এবং বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির ব্যবস্থা রাখার জন্য কেন্দ্র সচিবদের অনুরোধ করা হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, গ্রামের অনেক গরিব অভিভাবক তাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে মাসে ৫০থেকে১০০(ডলার) বা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ধারদেনা করেন। তাদের এই ত্যাগের সম্মান রক্ষার্থে পরীক্ষাটি যেন একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে হয়, তা নিশ্চিত করা সবার নৈতিক দায়িত্ব।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে জানানো হয়, পরীক্ষার্থীরা যেন কোনো ধরনের মানসিক চাপ ছাড়াই নির্বিঘ্নে ও সুন্দর পরিবেশে পরীক্ষা দিতে পারে, সে লক্ষ্যে সকল ধরনের প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। পরীক্ষা চলাকালীন কেন্দ্রের বাইরে ১৪৪ ধারা জারি থাকবে এবং কোনো ধরনের ভিড় করতে দেওয়া হবে না। উপজেলা প্রশাসন এই পরীক্ষা ১০০% সুষ্ঠু ও সফলভাবে সম্পন্ন করতে শিক্ষক, অভিভাবক, সাংবাদিক ও স্থানীয় সুশীল সমাজের সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছে।














