যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এক বিশাল আইনি ও রাজনৈতিক পরাজয় ডেকে এনেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের একটি নতুন রায়। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত তা সরাসরি বাতিল করে দিয়েছেন। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন বিচারপতির মধ্যে ৬ জনই ট্রাম্পের আদেশের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন, ফলে ৬-৩ ভোটে এই ঐতিহাসিক রায় পাস হয়। এই রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট মূলত নিম্ন আদালতের একটি পুরোনো সিদ্ধান্তকেই বহাল রেখেছেন, যেখানে ট্রাম্পের ওই নির্বাহী আদেশটিকে আগেই স্থগিত করা হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর তার দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের একেবারে প্রথম দিনেই এই কড়া নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। ওই আদেশে তিনি মার্কিন সব সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কোনো শিশুর মা–বাবা যদি মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বৈধ বাসিন্দা না হন, তবে সেই শিশুকে যেন কোনোভাবেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দেওয়া না হয়। মূলত বৈধ ও অবৈধ অভিবাসনের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিবাসীদের ভয় দেখানোর অংশ হিসেবেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু মানবাধিকার কর্মী ও আইনজ্ঞরা শুরু থেকেই এই আদেশের তীব্র সমালোচনা করে আসছিলেন।
ট্রাম্প তার ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে বারবার এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে। কিন্তু দেশটির স্বাধীন বিচার বিভাগ তাকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চলতি বছর দ্বিতীয়বারের মতো আদালত ট্রাম্পের কোনো বড় ও প্রভাব বিস্তারকারী পদক্ষেপ পুরোপুরি বাতিল করে দিলেন। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসেও বিশ্বজুড়ে আমদানি করা পণ্যের ওপর ট্রাম্পের জারি করা একটি ব্যাপক বৈশ্বিক শুল্ক আদেশ বাতিল করে দিয়েছিলেন আদালত। সেবারও ট্রাম্পের অর্থনীতি ও বাণিজ্যনীতি বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছিল।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায়টি লিখেছেন স্বয়ং প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস। তিনি তার রায়ে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে বেআইনিভাবে বা সাময়িকভাবে বসবাসরত মা–বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তানরাও মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী ১০০% ‘জন্মসূত্রে নাগরিক’ হওয়ার অধিকার রাখে। এখানে শিশুর মা-বাবার আইনি স্ট্যাটাস বা বৈধতা কোনোভাবেই শিশুর নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে না। এই রায় আমেরিকার লাখ লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসী পরিবারের জন্য এক বিশাল স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে।
রায়ের স্বপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি দেশটির গৃহযুদ্ধের পর পাস হওয়া বিখ্যাত ১৪তম সংশোধনীর প্রসঙ্গ টেনেছেন। গৃহযুদ্ধের পর মুক্ত হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সাবেক দাসদের নাগরিকত্বের আইনি বিষয়টি চিরতরে মীমাংসা করার জন্যই এই সংশোধনী পাস করা হয়েছিল। জন রবার্টস তার রায়ে লিখেছেন, “নাগরিকত্ব হলো তখনো এবং এখনো আমাদের রাজনৈতিক সম্প্রদায়ে অবাধে অংশগ্রহণের অধিকার পাওয়ার অধিকার। চতুর্দশ সংশোধনীর প্রণেতারা ‘এই ভূখণ্ডে মুক্তভাবে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষের’ জন্য সেই প্রতিশ্রুতি প্রসারিত করেছিলেন। আমরা আজ সেই ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতিই বজায় রাখছি এবং এর কোনো বিকৃতি বা পরিবর্তন আমরা মেনে নিতে পারি না।”
তবে ট্রাম্পের জন্য আজকের দিনে শুধু খারাপ খবরই ছিল না, একটি ভালো খবরও ছিল। সুপ্রিম কোর্ট অন্য একটি রায়ে স্কুল ও কলেজে মেয়েদের খেলাধুলায় ট্রান্সজেন্ডার নারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন। অর্থাৎ, জন্মগতভাবে ছেলে কিন্তু পরে লিঙ্গ পরিবর্তন করে নারী হওয়া ব্যক্তিরা মেয়েদের খেলাধুলায় অংশ নিতে পারবেন না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই রায়কে তার রক্ষণশীল নীতির জন্য একটি ‘বড় জয়’ বলে অভিহিত করেছেন এবং উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের এই দুটি রায় আমেরিকার রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় আগামী দিনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। একদিকে অভিবাসীরা তাদের অধিকার ফিরে পেয়েছেন, অন্যদিকে ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।














