সুইডেনকে উড়িয়ে শেষ ষোলোতে ফ্রান্স: এমবাপ্পে, দেশম ও ওলিসের এক স্মরণীয় রাত

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

এই ম্যাচটা নিঃসন্দেহে ছিল ফরাসি সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পের। এই ম্যাচটা ছিল ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমেরও। আর এই ম্যাচটা ছিল তরুণ মিডফিল্ডার মাইকেল ওলিসেরও। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মাঠে সুইডেনকে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে পা রেখেছে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। এমবাপ্পের জোড়া গোল, দেশমের ডাগআউটে ফেরা এবং ওলিসের জাদুকরী প্লে-মেকিং সব মিলিয়ে এই রাতটা ফরাসি ফুটবল ভক্তদের জন্য চিরকাল মনে রাখার মতো একটি রাত হয়ে থাকবে।

ম্যাচের শুরুতে অবশ্য সুইডেন বেশ আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ফ্রান্সকে চমকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের সেই চমক বেশিক্ষণ টেকেনি। ঘড়ির কাঁটায় যত সময় গড়িয়েছে, ততই যেন নিজেদের চেনা ছন্দে ফিরেছে ফ্রান্স। বলের ১০০% দখল, নিখুঁত পাসের গতি আর আক্রমণের ধারে পুরো মাঠ জুড়ে দাপট দেখাতে শুরু করে ফরাসিরা। সত্যি কথা বলতে, ৩-০ গোলের এই ব্যবধানও ফ্রান্সের আসল আধিপত্য পুরোপুরি বোঝাতে পারে না। কারণ, তাদের অন্তত দুটি শট গোলপোস্টে লেগে ফিরে এসেছে এবং আরও কয়েকটি সহজ সুযোগ অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। এমনকি এমবাপ্পের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিলও হয়েছে।

এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আবেগঘন মুহূর্তটি ছিল কোচ দিদিয়ের দেশমের মাঠে ফেরা। মায়ের মৃত্যুতে তিনি দেশে ফিরে গিয়েছিলেন এবং এক ম্যাচ পর আবার ডাগআউটে ফিরেছেন। ফেরার ম্যাচেই শিষ্যদের কাছ থেকে এমন একটি ‘মাস্টারক্লাস ফুটবল’ উপহার হিসেবে পেলেন তিনি। এমবাপ্পেরা প্রতিটি গোলের পর উৎসবের মধ্যমণি বানিয়েছেন তাদের প্রিয় কোচকেই। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে উসমান দেম্বেলের দারুণ এক পাস থেকে ডান পায়ের জোরালো শটে যখন এমবাপ্পে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন, তখন পুরো দল ছুটে যায় সাইডলাইনের দিকে। মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে ফেরা কোচকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে তারা এই গোলটি উদ্‌যাপন করে।

বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে চার গোল করা এমবাপ্পে আজও নিজের নামের প্রতি সুবিচার করেছেন। ৭৪ মিনিটে মাইকেল ওলিসের বাড়ানো বল থেকে তিনি নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন। এই জোড়া গোলের সুবাদে এমবাপ্পে এখন বিশ্বকাপ নকআউটে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক। বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা এখন ১৮টি, যা লিওনেল মেসির চেয়ে মাত্র একটি কম। তবে একটি জায়গায় তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ১০ গোলের রেকর্ড এখন এককভাবে তাঁর দখলে। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল লিওনাদাইজ ও রোনালদো নাজারিওর (৮ গোল)। এবারের বিশ্বকাপে ৬ গোল করে তিনি এখন গোলদাতার তালিকাতেও মেসির ঠিক পাশে বসেছেন।

তবে নিউ জার্সির এই রাতটাকে এমবাপ্পে ও দেশমের করে তোলার আসল নায়ক ছিলেন ২৪ বছর বয়সী তরুণ মিডফিল্ডার মাইকেল ওলিসে। তিনি নিজে কোনো গোল না করলেও দুটি দুর্দান্ত গোল করিয়েছেন। ভাগ্য একটু সহায় থাকলে তিনি হয়তো এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে দর্শনীয় গোলটিও পেয়ে যেতেন, কিন্তু তাঁর একটি দুর্দান্ত বাইসাইকেল কিক দুর্ভাগ্যজনকভাবে পোস্টে লেগে ফিরে আসে। তবে গোল না পেলেও তিন দশকের মধ্যে বিশ্বকাপের এক আসরে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্টের রেকর্ড নিয়েই মাঠ ছেড়েছেন ওলিসে।

দ্বিতীয়ার্ধের দুটি গোলেই ওলিসের সরাসরি অবদান ছিল। ৫৩ মিনিটে তাঁর নিখুঁত থ্রু পাস ধরে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ব্র্যাডলি বারকোলা। আর ৭৪ মিনিটে এমবাপ্পের গোলটিও আসে তাঁর পাস থেকেই। এই দুই অ্যাসিস্টের মাধ্যমে এবারের বিশ্বকাপে তাঁর মোট অ্যাসিস্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫-এ, যা ১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর এক টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ। তবে শুধু পরিসংখ্যানই নয়, পুরো ম্যাচজুড়েই ফ্রান্সের আক্রমণের ছন্দটা যেন তিনিই একাই ঠিক করে দিয়েছেন। মাঝমাঠ থেকে একের পর এক রক্ষণচেরা পাসে সুইডেনের রক্ষণভাগকে তিনি রীতিমতো তটস্থ করে রেখেছেন।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার অনেক আগেই যখন ফলাফল প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন ৮৫ মিনিটে এমবাপ্পেকে তুলে নেন কোচ দেশম। মাঠ ছাড়ার সময় গ্যালারিতে উপস্থিত প্রায় ৮০ হাজার দর্শক দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে (স্ট্যান্ডিং ওভেশন) ফ্রান্স অধিনায়ককে সম্মান জানান। ম্যাচশেষে দেশম আর ওলিসেরাও দর্শকদের কাছ থেকে তুমুল হাততালি পেয়েছেন। আগামী ৪ জুলাই রাতে শেষ ষোলোর ম্যাচে ফ্রান্স খেলবে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে। তারা সবাই মিলে যেন আজই জানিয়ে দিলেন, আগামী ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালেও এই নিউ জার্সিতে খেলার অন্যতম বড় দাবিদার তারাই।

সম্পর্কিত নিবন্ধ