টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিপাত আর ভারত থেকে হু হু করে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার প্রধানতম নদী দুধকুমারের পানি এখন বিপদসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর দুকূল উপচে অববাহিকার চর ও ডুবোচরে হুড়মুড় করে পানি ঢুকে পড়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হঠাৎ করে পানি চলে আসায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। চারদিকে থইথই পানি, আর এই পানির মধ্যে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৯ জুন) বিকেল ৩টায় দুধকুমার নদের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে ২৯.৮৪ সেন্টিমিটার রেকর্ড করা হয়েছে। এই নদে পানির বিপদসীমা নির্ধারণ করা আছে ২৯.৬০ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ, দুধকুমার নদের পানি এখন বিপদসীমার অন্তত ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। পাউবো আরও জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে কুড়িগ্রামের অন্যান্য নদ-নদীর পানিও আরও ৫০% থেকে ৬০% বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে এই অঞ্চলে একটি স্বল্পমেয়াদি কিন্তু ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।
পানি বৃদ্ধির ফলে নদী তীরবর্তী নিচু অঞ্চলগুলো সবার আগে প্লাবিত হয়েছে। চরাঞ্চলে পানি ওঠার ফলে সেখানকার বাসিন্দারা একেবারে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। পানিতে তলিয়ে গেছে চরের হাজার হাজার একর জমির শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ। কৃষকরা ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে যে ফসল ফলিয়েছিলেন, তা এখন পানির নিচে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বন্যায় কৃষকদের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা হয়তো হাজার হাজার ডলার ($) বা কয়েক কোটি টাকার সমান। ফসল হারিয়ে কৃষকরা এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন।
বন্যার পানি সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে দুধকুমার নদীর অববাহিকায় থাকা তিলাই ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের দক্ষিণ তিলাই ও দক্ষিণছাট গোপালপুর গ্রামের অন্তত চার শতাধিক বাড়িঘরে ইতিমধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে। এছাড়া পাইকেরছড়া ইউনিয়নের ছিটপাইকের ছড়া ও পাইক ডাঙ্গা, সোনাহাট ইউনিয়নের চরবলদিয়া, চর শতিপুরি, চর-ভূরুঙ্গামারী ইউনিয়নের ইসলামপুর এবং আন্ধারিঝাড় ইউনিয়নের চর বারুইটারী ও চর ধাউরারখুটিসহ বেশকিছু চরাঞ্চল সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার প্রায় ৩ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
দুধকুমার নদী পাড়ের বাসিন্দা হাসেম আলী, ফরিদুল, খোকন ও আব্দুল জলিল তাদের চরম অসহায়ত্বের কথা জানান। তারা বলেন, “আমাদের বাড়ির ভেতরে পানি উঠে গেছে। পরিবারের মানুষজনকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি, কিন্তু গবাদিপশু এবং হাঁস-মুরগি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছি। এদের রাখার কোনো শুকনো জায়গা নেই। এর ওপর নদীভাঙন আতঙ্কে আমরা দিন পার করছি।” পাইকেরছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক জানান, তার ইউনিয়নের পাইকডাঙ্গা ও ছিট পাইকের ছড়া গ্রামের তিন শতাধিক পরিবার এখন পানিবন্দী অবস্থায় আছে। তিলাই ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামানও আক্ষেপ করে বলেন, তার ইউনিয়নের ৩টি ওয়ার্ডের চার শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হলেও সোমবার পর্যন্ত তিনি কোনো সরকারি ত্রাণ বরাদ্দ পাননি।
তবে প্রশাসন বলছে তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ শুরু করেছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সবুজ কুমার গুপ্ত জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তা হিসেবে ইতিমধ্যে ৩০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এই চালের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫,০০০$ (ডলার) এর কাছাকাছি। বরাদ্দকৃত এই চাল উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নে ৫.৫ টন, তিলাই ইউনিয়নে ৪ টন, পাইকেরছড়া ইউনিয়নে ৪ টন, চর ভূরুঙ্গামারী ইউনিয়নে ৪ টন, আন্ধারিঝাড় ইউনিয়নে ৫ টন, বলদিয়া ইউনিয়নে ১.৫ টন, বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নে ৩ টন এবং ভূরুঙ্গামারী সদর ইউনিয়নে ৩ টন করে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই এসব চাল পানিবন্দী মানুষের হাতে পৌঁছে যাবে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অমৃত দেবনাথ সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি জানান, বন্যা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখতে উপজেলা পর্যায়ে একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এই কন্ট্রোল রুমের সাথে সংশ্লিষ্ট সব ইউপি চেয়ারম্যানকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য মেডিকেল টিমও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের ১০০% পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।














