পলাশবাড়ীতে রামমূর্তি নির্মাণ স্থগিত: শতকোটি টাকার মন্দির প্রকল্পের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্যরামচন্দ্রপুর (বৃন্দাবনপাড়া) গ্রামে একটি বিশাল মন্দির নির্মাণকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ ও কালী মন্দির নামের এই নির্মাণাধীন প্রকল্পটিতে বিশাল আকৃতির সব দেব-দেবীর মূর্তি ও ব্যাপক অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ যেমন প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থীর আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তেমনি এর বিপুল ব্যয়ের পরিমাণ এবং অর্থের উৎস নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ দানা বেঁধেছে।

স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, সম্প্রতি এই মন্দির প্রাঙ্গণে প্রায় ৮২ ফুট উচ্চতার একটি বিশাল রামমূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে তীব্র আপত্তি, আন্দোলন ও সমালোচনা শুরু হয়। মুসলিম অধ্যুষিত একটি এলাকায় এমন বিশাল রামমূর্তি নির্মাণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেওয়ায়, মন্দির কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে এই রামমূর্তির নির্মাণকাজ আপাতত স্থগিত রেখেছে। তবে মন্দির কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এটি একটি সাময়িক সিদ্ধান্ত এবং মন্দিরের অন্যান্য ধর্মীয় ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে চলছে।

বর্তমানে এই মন্দির প্রাঙ্গণে গেলে যে কারও চোখ কপালে উঠবে। সেখানে ইতিমধ্যে প্রায় ২৮ ফুট উচ্চতার একটি শিবমূর্তি এবং প্রায় ৫৩ ফুট উচ্চতার একটি বিশাল কৃষ্ণমূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেব-দেবীর আরও দেড় শতাধিক মূর্তি সেখানে তৈরি করা হয়েছে। শুধু মূর্তিই নয়, এই বিশাল প্রকল্পে একটি গুরুকুল, গীতাশিক্ষা কেন্দ্র, বৃদ্ধাশ্রম, মেডিকেল কলেজ, রিসোর্ট, ধর্মীয় গবেষণা কেন্দ্র এবং পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন আধুনিক স্থাপনা গড়ে তোলার কাজও পুরোদমে চলছে।

এত বড় একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিক কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং কীভাবে তা পরিচালিত হচ্ছে—এসব বিষয়ে এখন জনমনে চরম কৌতূহল ও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই প্রকল্পের মোট ব্যয়, অর্থের উৎস, দেশ-বিদেশ থেকে আসা অনুদানের হিসাব এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মন্দির কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো অডিট বা নিরীক্ষা প্রতিবেদন সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করেনি। সাধারণ মানুষের ধারণা, এই পুরো প্রকল্প শেষ করতে হয়তো কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) বা শতকোটি টাকার বেশি খরচ হবে।

অর্থের উৎস নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হরিদাস চন্দ্র তরনী দাসের (তাওহীদ) দেওয়া বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের কাছে প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেছেন। কোনো সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন যে এটি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি হচ্ছে, আবার কোথাও বলেছেন তার ব্যবসা থেকে অর্জিত টাকা দিয়ে তিনি এই কাজ করছেন। কিন্তু সম্প্রতি একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি আবার দাবি করেন যে, বর্তমানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ভক্তদের দেওয়া অনুদানেই এই বিশাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলছে। তার এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্যের কারণেই সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহল ও সন্দেহ আরও অন্তত ৫০% বেড়ে গেছে।

আইনজীবীদের মতে, ধর্মীয় স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার। ফলে যেকোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় আইন মেনে তাদের উপাসনালয় নির্মাণ ও পরিচালনা করতে পারে, এতে কারও কোনো বাধা দেওয়ার অধিকার নেই। কিন্তু যখন কোনো প্রকল্পে শতকোটি টাকা বা মিলিয়ন ডলার ($) ব্যয়ের কথা ওঠে, তখন সেই অর্থের উৎস, আর্থিক লেনদেন ও ব্যয়ের ১০০% স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জনস্বার্থের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, মানি লন্ডারিং বা অবৈধ অর্থ পাচার রোধে দেশের আইন সবার জন্যই সমান।

স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, এ ধরনের বড় প্রকল্পে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়, তবে একদিকে যেমন সব অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের চিরতরে অবসান হবে, অন্যদিকে প্রকল্পটির গ্রহণযোগ্যতাও সাধারণ মানুষের কাছে বৃদ্ধি পাবে। তাদের মতে, প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) বা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থার মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ অনুসন্ধান পরিচালনা করা উচিত, যাতে জনমনে বিদ্যমান সব সংশয় দূর হয়।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা দাবি করছেন, মন্দির কর্তৃপক্ষ যদি তাদের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী, অনুদানের উৎস, প্রকল্পের মোট ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা জনসম্মুখে বা গণমাধ্যমে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করে, তবে এই চলমান বিতর্ক অনেকাংশেই প্রশমিত হবে। সবার একটাই অভিমত, যেকোনো কাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত হলেই সমাজে সব ধর্মের মানুষের মাঝে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ