বর্তমানে যারা পুরো বিশ্বের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাদের অনেকেই সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মাননি। কারও শৈশব কেটেছে রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে চা বিক্রি করে, কাউকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রুটি বেচতে হয়েছে, আবার কাউকে রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে পাহাড়ি গুহায় নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে। আজ তারা বিশ্বের সবচেয়ে প্রতাপশালী রাষ্ট্রনায়ক। কিন্তু ক্ষমতার এই শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছানোর পথটি তাদের জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। শুধু বইয়ের পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং জীবনের কঠিন পাঠশালা থেকেই তারা পেয়েছেন বিশ্বশাসনের মূল রসদ। চলুন জেনে নিই বিশ্বের ছয়জন প্রভাবশালী নেতার সেই সংগ্রামী শিক্ষাজীবন ও অজানা জয়গাথার গল্প।
ডোনাল্ড ট্রাম্প (যুক্তরাষ্ট্র)
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিক্ষাজীবন বেশ বৈচিত্র্যময়। ১৯৪৬ সালে নিউইয়র্কের এক ব্যবসায়ী পরিবারে তার জন্ম। ছোটবেলায় তিনি বেশ উদ্ধত ও জেদি স্বভাবের ছিলেন। তাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার বাবা-মা তাকে ‘নিউইয়র্ক মিলিটারি একাডেমি’তে পাঠিয়ে দেন। এই একাডেমির কঠোর নিয়মকানুনই তার পরবর্তী জীবনের শৃঙ্খলার ভিত্তি গড়ে দেয়। পরে তিনি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার বিখ্যাত ‘হোয়ার্টন স্কুল’ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবনের একটি বড় দিক হলো তার নেশামুক্ত জীবন। বড় ভাই অতিরিক্ত মদ্যপানে মারা যাওয়ায় ট্রাম্প জীবনে কখনোই মদপান বা ধূমপান করেননি। রিয়ালিটি শোয়ের সঞ্চালক থেকে তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে ইতিহাস গড়েছেন।
ভ্লাদিমির পুতিন (রাশিয়া)
রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে। ১৯৫২ সালে তৎকালীন লেলিনগ্রাদে (বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গ) এক সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে তার জন্ম। ছোটবেলায় তিনি বেশ জেদি ছিলেন। একবার একটি ইঁদুরকে কোণঠাসা করতে গিয়ে তিনি জীবনের বড় এক শিক্ষা পান, যখন ইঁদুরটি পালানোর পথ না পেয়ে তাকেই পাল্টা আক্রমণ করে বসে। পুতিন এরপর জুডোতে মনোযোগ দেন এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ হন। তিনি লেলিনগ্রাদ স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে স্নাতক এবং পরে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করেই তিনি সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে রাশিয়ার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসীন হন।
মোজতবা খামেনি (ইরান)
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে তার বাবার উত্তরসূরি হিসেবে অত্যন্ত নিভৃতে গড়ে তোলা হয়েছে। ১৯৬৯ সালে জন্ম নেওয়া মোজতবা তেহরানের অভিজাত স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং পরে রেভোল্যুশনারি গার্ডসে (আইআরজিসি) যোগ দিয়ে ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ইরানের পবিত্র শহর কোমের বিভিন্ন সেমিনারিতে দীর্ঘ সময় ধরে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তিনি ‘আয়াতুল্লাহ’ উপাধি পেয়েছেন, যার অর্থ তিনি ইসলামি আইনশাস্ত্রে স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তার এই গভীর পাণ্ডিত্য ও সামরিক জ্ঞান তাকে ইরানের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে যাচ্ছে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (ইসরায়েল)
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্ম তেল আবিবে হলেও তার শিক্ষার বড় অংশ কেটেছে যুক্তরাষ্ট্রে। তিনি আমেরিকার বিখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে স্থাপত্যে স্নাতক এবং ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি ইসরায়েলের স্পেশাল ফোর্সে যোগ দিয়ে যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। বইয়ের পাতার সঙ্গে বারুদের গন্ধের এই সহাবস্থান তাকে একজন তুখোড় তার্কিক ও কৌশলী কূটনীতিবিদ হিসেবে গড়ে তুলেছে, যা তাকে ইসরায়েলের রাজনীতিতে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (তুরস্ক)
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। পড়াশোনার খরচ চালাতে তাকে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় লেবুর শরবত ও ‘সিমিত’ (একধরনের রুটি) বিক্রি করতে হতো। এই সংগ্রামী জীবনই তাকে সাধারণ মানুষের নেতা বানিয়েছে। তিনি একটি ধর্মীয় বৃত্তিমূলক স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে পরে মারমারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও জনপ্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি অত্যন্ত ভালো ফুটবল খেলতেন। তার সেই মাঠের নেতৃত্ব ও ধর্মীয় মূল্যবোধই আজকের তুরস্কের একচ্ছত্র নেতা হিসেবে তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সি চিন পিং (চীন) ও নরেন্দ্র মোদি (ভারত)
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রভাবশালী পরিবারে জন্ম নিলেও বাবার রাজনৈতিক পতনের কারণে তাকে দীর্ঘ ৭ বছর এক পাহাড়ি গুহায় বাস করতে হয়েছে। সেখানে সাধারণ কৃষকদের সঙ্গে কাজ করেই তিনি মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখেন। পরে তিনি রসায়ন প্রকৌশল ও আইনে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। অন্যদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শৈশব কেটেছে ভাদনগর রেলস্টেশনে বাবার চায়ের দোকানে চা বিক্রি করে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি আধ্যাত্মিকতার খোঁজে হিমালয়ে চলে যান। ফিরে এসে আরএসএসের কর্মী হিসেবে যোগ দেন এবং কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ জীবনযাপন করে আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ চালাচ্ছেন।
















