খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় ছাড়: এককালীন পরিশোধে মিলবে পুরো সুদ মওকুফ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম হলো খেলাপি ঋণ। বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকা এই বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো নতুন করে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিতে পারছে না। এই সংকটজনক পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে একটি বড় ও যুগান্তকারী ছাড় বা ‘এক্সিট সুবিধা’ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে মন্দ বা খেলাপি ঋণের গ্রহীতারা চাইলে শুধু আসল টাকাটা এককালীন পরিশোধ করে ব্যাংক থেকে চিরতরে দায়মুক্ত হতে পারবেন।

সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই এক্সিট সুবিধা-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে এবং দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের (এমডি) কাছে তা পাঠানো হয়েছে। নতুন এই প্রজ্ঞাপনে গ্রাহকদের ব্যাংকঋণের ওপর আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে আগের থাকা সব কঠোর শর্ত অনেকটাই শিথিল করা হয়েছে। ব্যাংকাররা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে যেসব খেলাপি ঋণ একেবারে অনাদায়ী বা আদায় অযোগ্য পর্যায়ে চলে গেছে, ব্যাংক চাইলে এখন শুধু সেসব ঋণের আসল অংশটুকু আদায় করে পুরো সুদ মওকুফ করে দিতে পারবে। এত দিন আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে ব্যাংকগুলোর পক্ষে গ্রাহকদের এত বড় ছাড় দেওয়ার সুযোগ খুব কম ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রজ্ঞাপনে এই ছাড় দেওয়ার পেছনের কারণ খুব পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তারা বলেছে, দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও একটি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান চরমভাবে নষ্ট হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর তারল্য বা নগদ টাকার ব্যবস্থাপনায় সংকট দেখা দিচ্ছে এবং এর ফলে তাদের নতুন করে ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের পাহাড়সমান খেলাপি ঋণ যেকোনো মূল্যে কমিয়ে আনা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নীতিমালায় আরও জানিয়েছে, যেসব ঋণগ্রহীতা বিভিন্ন কারণে হঠাৎ আর্থিক সংকটে পড়েছেন কিন্তু তাদের এখনো ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে এবং ঋণ পরিশোধের আন্তরিকতা রয়েছে, মূলত তাদেরকেই এই এককালীন বিশেষ এক্সিট সুবিধা দেওয়া হবে। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে গ্রাহকরা যদি তাদের ঋণ পরিশোধ করেন, তবে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ অন্তত ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত কমে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন। এতে ব্যাংকগুলোর হাতে নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো হাজার হাজার কোটি টাকা বা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) চলে আসবে, যা দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে এবার সবচেয়ে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর যেসব ঋণ মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি হয়ে আছে, শুধুমাত্র সেগুলোই এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আসবে। তবে এই সুবিধা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চূড়ান্ত অনুমোদন লাগবে এবং এটি সম্পূর্ণভাবে ব্যাংকার ও গ্রাহকের সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। এই সুবিধার প্রধান ও একমাত্র শর্ত হলো, ঋণগ্রহীতাকে তাঁর মূল ঋণের সব দায় এককালীন বা এক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। আর এটি নিশ্চিত করতে পারলেই ঋণগ্রহীতাদের সব ধরনের আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের পথ ১০০% সহজ হয়ে যাবে।

আগে সুদ মওকুফ করতে গেলে ব্যাংকগুলোকে তাদের তহবিল ব্যয় বা কস্ট অব ফান্ড আদায় নিশ্চিত করার একটি আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। এবার সেই নিয়ম শিথিল করা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর আয় খাত বিকলন করে সুদ মওকুফ না করার যে কঠিন শর্ত ছিল, সেটিও এবার শিথিল থাকবে। অর্থাৎ এখন থেকে সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংকই এই এক্সিট সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুদ মওকুফ করতে পারবে। এছাড়া মন্দ মানের যেসব ঋণ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে পুনঃতফসিল করা হয়েছে, সেগুলোও এই বিশেষ সুবিধা পাবে। এই ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষি খাতের স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ এবং কটেজ, মাইক্রো ও স্মল (সিএমএসএমই) ঋণকে ব্যাংকগুলোকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংক এই নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বিশেষ নীতিমালার সুবিধা ও নির্দেশনা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তাই যেসব গ্রাহক খেলাপি ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে আছেন, তাদের উচিত এই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত নিজেদের ঋণ পরিশোধ করে ব্যাংক থেকে দায়মুক্ত হওয়া।

সম্পর্কিত নিবন্ধ