শৈলকুপায় পিকআপের ধাক্কায় এসএসসি পরীক্ষার্থীর মৃত্যু: দুই মাস আগে কেনা মোটরসাইকেলই কাল হলো

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মাত্র দুই মাস আগে অনেক শখ করে আর জেদ ধরে বাবার কাছ থেকে একটি নতুন মোটরসাইকেল কিনেছিল ছেলে। স্বপ্ন ছিল এই মোটরসাইকেলে চড়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়াবে, কলেজে যাবে। কিন্তু কে জানত, শখের সেই মোটরসাইকেলটিই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে? ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেলের এক ভয়ংকর মুখোমুখি সংঘর্ষে তীর্থ বিশ্বাস নামের ১৭ বছর বয়সী এক তরুণ এসএসসি পরীক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (২৯ জুন) বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে উপজেলার ভাটই বাজার এলাকায় এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে।

নিহত তীর্থ বিশ্বাস উপজেলার ভাটই গ্রামের বাসিন্দা তপন কুমার বিশ্বাসের ছেলে। সে স্থানীয় ভাটই মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। পরীক্ষার ফলাফল বের হওয়ার আগেই তার এই অকাল মৃত্যুতে পরিবার, স্কুল ও পুরো ভাটই গ্রামে এখন গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একটি তরতাজা প্রাণের এমন করুণ পরিণতি গ্রামের সাধারণ মানুষ কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তীর্থ তার শখের মোটরসাইকেলটি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। তার গন্তব্য ছিল ঝিনাইদহ শহর। সে যখন ভাটই সরকারি কলেজের সামনের রাস্তায় পৌঁছায়, তখন তার সামনে দিয়ে একটি পিকআপ ভ্যান যাচ্ছিল। তীর্থ সেই পিকআপটিকে ওভারটেক করার চেষ্টা করে। কিন্তু ওভারটেক করে সামনে এগোতেই বিপরীত দিক থেকে আসা ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়াগামী আরেকটি দ্রুতগতির পিকআপের সঙ্গে তার মোটরসাইকেলের সজোরে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, তীর্থ ছিটকে রাস্তার ওপর পড়ে যায় এবং তার মোটরসাইকেলটি দুমড়েমুচড়ে যায়। মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় ঘটনাস্থলেই তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। আশপাশের লোকজন দ্রুত ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে তীর্থ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

ছেলের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাবা তপন কুমার বিশ্বাস একেবারে শোকে ভেঙে পড়েছেন। তিনি কোনোভাবেই নিজের কান্না থামাতে পারছিলেন না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “মাত্র দুই মাস আগে আমার ছেলে এই মোটরসাইকেলটা কিনে দেওয়ার জন্য অনেক জেদ করেছিল। আমি প্রথমে রাজি ছিলাম না, কিন্তু ওর জেদের কাছে বাধ্য হয়ে অনেক টাকা খরচ করে গাড়িটা কিনে দিয়েছিলাম। আজ সেই মোটরসাইকেলটাই আমার বুকের ধনকে চিরতরে কেড়ে নিল। আমি এখন ওকে ছাড়া কী নিয়ে বাঁচব!” একজন বাবার এই আহাজারিতে সেখানে উপস্থিত সবার চোখেই পানি চলে আসে।

আমাদের দেশে বর্তমানে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে ঘটা মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৪০% থেকে ৪৫% ঘটনাই ঘটে মোটরসাইকেলের কারণে। আর এই দুর্ঘটনায় যারা মারা যান বা পঙ্গু হন, তাদের বেশির ভাগের বয়সই ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। একটি সাধারণ মানের নতুন মোটরসাইকেল কিনতে গেলে বর্তমানে প্রায় ১,৫০০থেকে২,০০০ (ডলার) বা দেড় থেকে দুই লাখ টাকার মতো খরচ হয়। অনেক বাবা-মা সন্তানদের জেদের কাছে হার মেনে এই বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে তাদের হাতে মৃত্যুর পরোয়ানা তুলে দিচ্ছেন। তরুণরা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায় এবং হেলমেট বা অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রী ঠিকমতো ব্যবহার করে না, যার ফলে সামান্য দুর্ঘটনাতেই তাদের প্রাণ চলে যায়।

খবর পেয়ে ঝিনাইদহ আরাপপুর হাইওয়ে থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহানুর আলী সংবাদমাধ্যমকে দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনার পরপরই ঘাতক পিকআপ ভ্যানটিকে পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয়েছে। তবে চালক সুকৌশলে পালিয়ে গেছে। নিহতের মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

ওসি আরও জানান, পুলিশ এই ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত করছে এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তিনি সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে অভিভাবকদের প্রতি একটি সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং যাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, তাদের হাতে কোনোভাবেই মোটরসাইকেল দেওয়া উচিত নয়। একটু সচেতনতা ও সাবধানতাই পারে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকাতে এবং একটি পরিবারকে সারাজীবনের কান্নার হাত থেকে বাঁচাতে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ