নীলফামারীতে পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে প্রবাসীর পরিবারের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ১

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলায় পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে এক প্রবাসী পরিবারের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার উত্তর তিতপাড়া বা খালুয়াপাড়া গ্রামে সম্প্রতি এই ঘটনা ঘটে। বন্দক বা বন্ধকি জমির পাওনা টাকা ফেরত চাওয়ায় প্রতিপক্ষের লোকজন সংঘবদ্ধভাবে তাদের ওপর এই হামলা চালায়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ময়েন উদ্দিন (৫৭) বাদী হয়ে ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে ডিমলা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার পরপরই পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্তদের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া ওই ব্যক্তির নাম মো. সুমন ইসলাম (৩০), সে একই এলাকার জাহিদুল ইসলামের ছেলে।

মামলার আরজি এবং স্থানীয় সূত্র থেকে এই আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত ইতিহাস জানা গেছে। মামলার বাদী ময়েন উদ্দিন পুলিশকে জানান, আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগে, অর্থাৎ ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে একই এলাকার বাসিন্দা হবিবার রহমান নিকি এবং মনজিনা বেগম তাদের ভোগদখলে থাকা ১২ বিঘা জমি তার বড় ছেলে আসাদুল ইসলামের কাছে বন্ধক রাখেন। আসাদুল ইসলাম পেশায় একজন প্রবাসী এবং তিনি বিদেশে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে এই টাকা জমিয়েছিলেন। দুই পক্ষের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক বন্ধকনামা তৈরি হয় এবং তাতে স্বাক্ষর করে হবিবার ও মনজিনা মোট ২৪ লাখ টাকা নগদ গ্রহণ করেন। বর্তমান আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে এই ২৪ লাখ টাকার মান প্রায় ২০,০০০$ (ডলার) এর কাছাকাছি। একজন প্রবাসীর জন্য এটি তার জীবনের অনেক বড় একটি সঞ্চয়।

চুক্তি হওয়ার পর কিছুদিন সব ঠিকঠাকই চলছিল। এরপর হবিবার রহমান ওই ১২ বিঘা বন্ধকি জমির মধ্য থেকে ২ বিঘা জমি সরাসরি বাদীর ছেলে আসাদুল ইসলামের কাছে বিক্রি করে দেন। বাকি থাকা ১০ বিঘা জমিতে প্রতিপক্ষ নিজেরাই হালচাষ ও আবাদ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন দুই পক্ষের মধ্যে একটি মৌখিক অঙ্গীকার বা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী কথা ছিল, প্রতিপক্ষ ওই ১০ বিঘা জমিতে ফসল ফলিয়ে প্রতি সিজন বা মৌসুমে ফসলের লাভের একটি নির্ধারিত অংশ বা টাকা বাদীপক্ষের কাছে পৌঁছে দেবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, তারা সেই কথা রাখেনি। দীর্ঘদিন ধরে তারা ফসল ঘরে তুললেও বাদীপক্ষকে কোনো টাকা দিচ্ছিল না এবং বারবার টাকা দিতে অস্বীকার করে আসছিল।

পাওনা টাকা না পেয়ে প্রবাসী আসাদুল ইসলামের পরিবার বেশ হতাশ হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায়, গত ২৭ জুন সকালে মামলার বাদী ময়েন উদ্দিনের দুই ছেলে আসাদুল ইসলাম ও নুরুল ইসলাম এবং তার ভাতিজা রহমত আলী লিখন পাওনা টাকা চাইতে প্রতিপক্ষের বাড়িতে যান। তারা অত্যন্ত ভদ্রভাবে নিজেদের পাওনা টাকা ফেরত চান। কিন্তু টাকা ফেরত দেওয়ার বদলে প্রতিপক্ষের লোকজন হঠাৎ করেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে আসাদুল ও তার পরিবারের সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় তারা বেশ আহত হন এবং পরে স্থানীয়দের সাহায্যে তাদের উদ্ধার করা হয়।

এই হামলার ঘটনার পরপরই এলাকায় চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তারা প্রতি বছর দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ($) রেমিট্যান্স পাঠান। সেই প্রবাসীদের কষ্টের টাকা এভাবে আত্মসাৎ করা এবং উল্টো তাদের ওপর হামলা করার বিষয়টি স্থানীয় সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। এ বিষয়ে মামলার আরজিতে উল্লেখিত প্রধান অভিযুক্ত আলিনুর ইসলামসহ অন্যান্যদের সাথে তাদের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি এবং তাদের বাড়িতেও পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, মামলার খবর শুনে তারা সবাই গা ঢাকা দিয়েছেন।

ডিমলা থানা পুলিশ এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, “মামলা দায়ের হওয়ার পরপরই আমরা একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্তাধীন রয়েছে। বাকি আসামিদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুতই মামলার তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উন্মোচিত হবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।” পুলিশ সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও জনপ্রতিনিধিরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, গ্রামে এমন বন্ধকি জমির লেনদেন নিয়ে প্রায়ই ঝামেলা হয়, তবে এভাবে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক। তারা প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন, যেন এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হয় এবং প্রকৃত দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। যাতে ভবিষ্যতে কেউ প্রবাসীদের কষ্টের টাকা আত্মসাৎ করার বা তাদের ওপর হামলা করার সাহস না পায়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ