ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার একটি ছোট্ট ও ছিমছাম গ্রাম জোড়াদহ। এই নিভৃত পল্লীর এক অতি সাধারণ শিক্ষকের কুটির আলো করে জন্ম নিয়েছিল এক স্বপ্নবাজ ছেলে। নাম তার আনিসুজ্জামান সিদ্দিক ফখরুল। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পটভূমি, বিপুল অর্থবিত্ত কিংবা শহরের বিলাসী জীবন তার ছিল না। কিন্তু তার চোখে ছিল এক বুক বড় স্বপ্ন আর মনে ছিল হিমালয়সদৃশ অটুট প্রত্যয়। আজ সেই ছেলেটি নিজের মেধা, মনন ও অবিচল নিষ্ঠার জোরে স্পর্শ করেছে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখর। ৪৭তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে সহকারী কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট পদে তার এই সুপারিশপ্রাপ্তি কেবল একজন ব্যক্তির জয় নয়, বরং এটি সমগ্র জোড়াদহ গ্রামের এক ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল অর্জন।
আমাদের দেশের তরুণ সমাজের কাছে বিসিএস (BCS) বা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস একটি স্বপ্নের নাম। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ পরীক্ষার্থী এই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু এই লাখ লাখ মানুষের মধ্য থেকে মাত্র ১% থেকে ২% পরীক্ষার্থী চূড়ান্তভাবে ক্যাডার হওয়ার সুযোগ পান। এই তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে একজন শিক্ষার্থীকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। অনেক সময় শহরের নামীদামি কোচিং সেন্টারে পড়তে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বছরে প্রায় ৫০০থেকে১০০০ডলার বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো খরচ হয়ে যায়। কিন্তু ফখরুলের মতো গ্রামের সাধারণ পরিবারের সন্তানদের পক্ষে এত টাকা খরচ করা ১০০% অসম্ভব। তবুও তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও চরম অধ্যবসায়ের সামনে সমস্ত প্রতিকূলতা মাথা নত করতে বাধ্য।
জোড়াদহ গ্রামের মাটির পরতে পরতে যেন লুকিয়ে আছে ক্ষণজন্মা মনীষীদের গৌরব। তৎকালীন পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই গ্রামের অনেক মানুষ দেশের নানা ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। এই গ্রামেরই কৃতী মেয়ে মোছা. লাভলী খাতুন বর্তমানে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গ্রামের নাম উজ্জ্বল করছেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে, সুদীর্ঘ প্রায় ৬০ বছরের এক দীর্ঘ শূন্যতা ও প্রতীক্ষা এই গ্রামে বিরাজ করছিল। দীর্ঘ এই ৬ দশকের শূন্যতার অবসান ঘটিয়ে, সেই একই মাটির সুযোগ্য সন্তান আনিসুজ্জামান সিদ্দিক ফখরুল পুনরায় জোড়াদহ গ্রামকে এনে দিলেন এক অনন্য প্রশাসনিক গৌরব। তার এই সাফল্যে আজ পুরো গ্রাম আনন্দে ভাসছে।
“যে মাটির বুক চিরে অন্ন জোগান পিতা, সেই মাটির বুক থেকেই জন্ম নেয় স্বপ্নজয়ের দৃঢ়তা।” ফখরুলের জীবন যেন এই কথারই বাস্তব রূপ। একজন নিষ্ঠাবান ও আদর্শ শিক্ষকের সন্তান হয়ে তিনি ছোটবেলা থেকেই সততা ও পরিশ্রমের শিক্ষা পেয়েছেন। দারিদ্র্য ও সীমাবদ্ধতার শৃঙ্খল ভেঙে তার এই ‘শেকড় থেকে শিখরে’ আরোহণের গল্প এখন এলাকার অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের মাঠে এখন শুধু ফখরুলের এই অভাবনীয় সাফল্যের গল্পই ঘুরেফিরে আলোচনা হচ্ছে। গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা তাকে নিয়ে গর্ব করছেন এবং ছোটদের তার মতো হওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন।
একজন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ফখরুল এখন দেশের সাধারণ মানুষের সরাসরি সেবা করার সুযোগ পাবেন। আমাদের সমাজে এখনো অনেক খেটে খাওয়া মানুষ প্রশাসনিক সেবা পেতে গিয়ে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। জোড়াদহ গ্রামের মুখ উজ্জ্বলকারী এই নতুন নক্ষত্রের কাছে এলাকার মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সবাই তাকে হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে সশ্রদ্ধ সালাম ও উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন। গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করেন, ফখরুল তার মেধা, সততা ও দেশপ্রেমের আলোয় সাধারণ মানুষের জীবনকে উদ্ভাসিত করবেন। মেহনতি মানুষের স্বপ্নপূরণের সারথি হয়ে তিনি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ গৌরব বয়ে আনবেন।
ফখরুলের এই সাফল্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মেধা কখনো গ্রামের কাদামাটিতে আটকে থাকে না। সঠিক লক্ষ্য আর নিরলস চেষ্টা থাকলে গ্রামের একটি সাধারণ ছেলেও একদিন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। আগামী দিনে ফখরুলের পেশাগত জীবন যেন কণ্টকমুক্ত ও সাফল্যমণ্ডিত হয়, সেই প্রার্থনাই করছেন তার পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসী। তার এই জয়রথ দেশের আরও হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণকে নতুন করে বাঁচার ও লড়াই করার সাহস জোগাবে।














