মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার জন্য জামায়াতকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান মির্জা ফখরুলের

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ একটি অত্যন্ত আবেগ ও মর্যাদার জায়গা। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে আজও দেশে তুমুল বিতর্ক হয়। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বর্তমান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, জামায়াতের এখনো সময় আছে নিজেদের অতীতের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সম্পর্কে দলটির বর্তমান অবস্থান সাধারণ মানুষের কাছে ১০০% পরিষ্কার করার।

আজ রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বিশাল বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী অত্যন্ত খোলামেলাভাবে এই কথাগুলো বলেন। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমাদের বন্ধুরা এখন সংসদে বসে বিভিন্নভাবে আমাদের ইগনোর বা উপেক্ষা করার চেষ্টা করছেন। তারা নানা কথায় আমাদের বিভিন্নভাবে ক্ষুব্ধ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমি মনে করি, তাদের এই আচরণ করার সময়টা এখন সঠিক নয়। অন্যদের সমালোচনা করার আগে নিজেদের অতীতের দিকেও আপনাদের একটু ফিরে তাকানো দরকার।”

মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলেন, “১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আপনাদের দল যে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা পালন করেছিল, তার জন্য আপনারা স্বাধীন দেশে একবারও ক্ষমা প্রার্থনা করলেন না। আপনাদের উচিত ছিল বহু আগেই জাতির সামনে দাঁড়িয়ে আপনাদের ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা। আপনারা যদি সেটা করতেন, তাহলে আজকে হয়তো রাজনীতিতে আপনাদের এই সংকট বা সমস্যাগুলো তৈরি হতো না। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আপনারা সেটা করেননি।”

জামায়াতের সাবেক শীর্ষ নেতার একটি মন্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আরও বলেন, “ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা, উপরন্তু আপনাদের দলের সাবেক শীর্ষ নেতা প্রয়াত গোলাম আযম সাহেব অত্যন্ত দম্ভের সাথে বলেছিলেন যে একাত্তরে তারা কোনো ভুল করেননি। আপনাদের এখনো সময় আছে, বিষয়টি নিয়ে আপনারা গভীরভাবে ভেবেচিন্তে দেখতে পারেন। বাংলাদেশ ও এর স্বাধীনতা সম্পর্কে আপনাদের আসল অবস্থান পরিষ্কার করে আমাদের এবং পুরো বাংলাদেশকে জানানো উচিত। আমি এর চেয়ে গভীরে আর যেতে চাই না। কিন্তু আপনারা একাত্তর সম্পর্কে কখনো আপনাদের ভুল পরিষ্কার করে বলেন না।”

মন্ত্রীর এই বক্তব্যের সময় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের দিক থেকে কিছু মন্তব্য বা শোরগোল ভেসে আসে। তখন মির্জা ফখরুল তাদের থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আপনারা একাত্তরের কথা পরিষ্কার করে বলেন না। আমি আজ পর্যন্ত আপনাদের মুখে এমন কথা শুনিনি, দেশের আর কেউও শোনেনি। আপনারা যদি আপনাদের অতীতের ভুল স্বীকার করে নেন, তবে দেশের রাজনীতি করা আপনাদের জন্য অনেক সহজ হয়ে যাবে।”

সংসদের এই আলোচনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জামায়াতের বর্তমান রাজনৈতিক সম্পর্ক ও জোট নিয়েও বেশ কড়া মন্তব্য করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। তিনি তরুণদের দল এনসিপির রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “তারা এমন একটা দলের সঙ্গে জোট করে রাজনীতি করছে, যারা কখনোই বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনি। আমি মন থেকে আশা করব, তারা (এনসিপি) তাদের রাজনীতিটা আরও পরিষ্কার করে সামনের দিকে নিয়ে আসবে।”

তরুণ প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে মির্জা ফখরুল অত্যন্ত গঠনমূলক একটি পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, “(এনসিপির) এই নবীন রাজনীতিবিদদের সামনে অনেক সুন্দর ভবিষ্যৎ আছে; তারা আগামী দিনে দেশের জন্য অনেক ভালো করবেন। আমরাও চাই তারা রাজনীতিতে ভালো করুন। কিন্তু এমন কোনো স্টিগমা বা কলঙ্ক নিয়ে তারা যেন পলিটিকসে বা রাজনীতিতে না থাকেন, যে কলঙ্ক যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে অস্বীকার করে চলেছে তাদের গায়ে লেগে আছে।” তার এই বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক জোট ও মেরুকরণের ক্ষেত্রে একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ