হরমুজ প্রণালিতে নতুন রুট নিয়ে বিভ্রান্তি, ইরানের হুশিয়ারিতে জাহাজ চলাচলে শঙ্কা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

“আমাদের পূর্বানুমতি ছাড়া কিংবা নির্ধারিত রুটের বাইরে দিয়ে কোনো জাহাজ যদি এই হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করে, তবে যেকোনো খারাপ পরিণতির জন্য তারা নিজেরাই ১০০% দায়ী থাকবে।” গত বৃহস্পতিবার ইরানের ক্ষমতাধর বিপ্লবী গার্ড কোর বা আইআরজিসি (IRGC) হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব বাণিজ্যিক জাহাজকে এমন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি জ্বালানি তেল পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের জন্য যে সাময়িক সমঝোতা হয়েছে, তার জন্য এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত কয়েক দিন ধরে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের সমুদ্র এলাকাগুলোতে উত্তেজনা কমার বদলে আরও বেড়েছে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই দুটি বড় বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের কড়া নজরদারি ও হয়রানি এড়াতে এখন অনেক আন্তর্জাতিক জাহাজ প্রণালির মাঝখানের পথ ছেড়ে দক্ষিণ দিকে ওমান উপকূলের কাছাকাছি একটি নতুন রুট ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। কারণ, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০% বা পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই একটি মাত্র পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। বর্তমান চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানকে যে বিষয়টিতে প্রধান ছাড় দিতে হবে, তা হলো এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন রাখা।

তবে ইরানের জন্য প্রণালিটি শুধু খুলে দেওয়ার মানে এই নয় যে, তারা এর ওপর থেকে নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের একটি অস্পষ্ট ধারায় বলা হয়েছে, ইরান ও ওমান যৌথভাবে এই পথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ঠিক করবে। এর সুযোগ নিয়ে তেহরান মূলত এই জলপথ পরিচালনার আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। তেহরানের অনুমোদন নেই, এমন যেকোনো বিকল্প রুটকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ ও ‘বেআইনি’ বলে সরাসরি ঘোষণা দিয়েছে আইআরজিসি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত রোববার এ বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ বা একই ধরনের ভিন্ন কোনো ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে। এতে উত্তেজনা বাড়বে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ আবার খুলে দিতে অযথাই দেরি হবে।

‘একই ধরনের ভিন্ন কোনো ব্যবস্থা’ বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছেন, তা আরাগচি স্পষ্টভাবে না বললেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন অনেক জাহাজ এখন ইরানের নিয়ন্ত্রণ এড়াতে প্রণালির দক্ষিণ দিকে ওমান উপকূল ঘেঁষে চলাচল করার যে চেষ্টা করছে, তিনি সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। বর্তমানে হরমুজ প্রণালির মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত জলপথে তিনটি আলাদা রুট বা পথ তৈরি হয়েছে। এসব রুট দিয়ে জাহাজ পারাপার সমন্বয় করতে বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দিচ্ছে। তিনটি রুটের একটি ওমান উপকূলের পাশ দিয়ে গেছে। দ্বিতীয় রুটটি যুদ্ধ শুরুর আগে ব্যবহার করা হতো, এটি প্রণালির ঠিক মাঝখান দিয়ে গেছে। আর উত্তরের তৃতীয় রুটটি পুরোপুরি ইরান নিয়ন্ত্রণ করে। এখন কোন পথটি বেছে নেবেন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ পরিচালনাকারীরা চরম বিপাকে ও আতঙ্কে পড়েছেন।

সমুদ্রপথে চলাচলের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘মারিস্কস’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দিমিত্রিস মানিয়াতিস সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, “এই জলপথে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে পুরো বিষয়টি এখন বেশ বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলেও আখ্যা দেন। তবে অনেক জাহাজচালক যে বিকল্প হিসেবে ওমান উপকূলবর্তী রুটটি ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তার শক্ত প্রমাণও পাওয়া গেছে। সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘উইন্ডওয়ার্ডের’ তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার হরমুজ দিয়ে ১৮টি জাহাজ ভেতরে ঢুকেছে এবং ৪৫টি জাহাজ বের হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, উপসাগরীয় অঞ্চল ত্যাগ করা জাহাজগুলোর অর্ধেকের বেশি বা প্রায় ৫০% ওমান উপকূলের কাছের রুটটি ব্যবহার করেছে।

হরমুজ দিয়ে জাহাজ পারাপারে কোন রুটটি ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ, তা নিয়ে অস্পষ্টতা কিছুতেই কাটছে না। এতে এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণ যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জাহাজে পণ্য পরিবহন–সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের মধ্যে কাগজে-কলমে যা চুক্তি হয়েছে, সাগরের বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত ‘এভার লাভলি’ নামের একটি জাহাজে ড্রোন হামলার পর আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) একটি সমন্বিত উদ্ধার অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। এই অভিযানে পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া পাঁচ শতাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ বের করে আনার কাজ চলছিল, যেখানে ১১ হাজারের বেশি নাবিক আটকে আছেন।

সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার পর অন্তত চারটি জাহাজ ভয়ে এই জলপথ থেকে ফিরে গেছে বলে উল্লেখ করেছেন সমুদ্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। যুদ্ধের সময় জাহাজের বিমার প্রিমিয়াম বা ইনস্যুরেন্স খরচ একেবারে আকাশচুম্বী হয়েছিল। বিশাল আকৃতির একেকটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তার জন্য মালিকদের তখন ১০ লাখ ডলারের ($১,০০০,০০০) বেশি প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছিল। বর্তমানে এমন হামলার ঘটনা কিছুটা কমে এলেও প্রিমিয়ামের উচ্চ হার এখনো কমেনি। বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনের তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশ্লেষক ম্যাথিউ রাইট বলেন, “আমরা এখনো ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মধ্যেই আছি। হরমুজ প্রণালি যে নিশ্চিতভাবে খুলে দেওয়া হবে, তেমন কোনো ১০০% নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি।” আগস্টের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতভেদ দূর না হলে জাহাজ চলাচল আরও অনিরাপদ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ