মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় ঘটে গেছে এক অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক ঘটনা। উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের কাটাবিল গ্রামে নিখোঁজ হওয়ার মাত্র এক দিন পর ধলাই নদী থেকে তামিম ইকবাল নামের ৫ বছর বয়সী এক নিষ্পাপ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মাত্র ৫ বছরের একটি ফুটফুটে শিশুর এমন অকাল ও পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারসহ পুরো কাটাবিল গ্রামে এখন চরম শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একটি সাজানো পরিবার এক রাতের ব্যবধানে কীভাবে তাদের একমাত্র চোখের মণি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেল, তা ভেবে গ্রামের মানুষও হতবাক ও বাকরুদ্ধ।
পরিবার ও স্থানীয় গ্রামবাসীদের কাছ থেকে এই মর্মান্তিক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানা যায়। শিশু তামিম ইকবালের বাবার নাম জমসেদ মিয়া। তিনি পেশায় একজন সাধারণ কৃষক ও দিনমজুর। গত শনিবার সকাল থেকেই জমসেদ মিয়া কাটাবিল এলাকায় নিজের জমিতে ধান কাটার কাজ করছিলেন। ৫ বছরের তামিম ছিল তার বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের সন্তান। তাই সারাদিন সে তার বাবার সঙ্গেই মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এবং বাবার কাজ দেখছিল। সারাদিন মাঠে কাটানোর পর সন্ধ্যায় বাবা-ছেলে মিলে বাড়িতে ফিরে আসেন।
বাড়িতে ফেরার পর রাতের বেলা ঘটে ওই দুঃখজনক ঘটনা। শনিবার রাতে তামিমদের বাড়ির সামনের একটি গ্রামীণ কাঁচা সড়কে মাটি কাটা ও মেরামতের কাজ চলছিল। কৌতূহলবশত ছোট্ট তামিম সেই কাজ দেখতে বাড়ির বাইরে যায়। সেখানে কাজ চলার কারণে রাস্তায় বেশ কাদা ছিল। মাটি কাটার সময় হঠাৎ করে তামিমের গায়ে কাদা ছিটে পড়ে এবং তার পরনের টি-শার্টটি নোংরা হয়ে যায়। এরপর তামিম দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসে এবং গায়ে থাকা কাদা মাখা টি-শার্টটি খুলে রেখে খালি গায়েই আবার বাইরে বের হয়ে যায়। পরিবারের লোকজন ভেবেছিল সে হয়তো বাড়ির সামনেই কোথাও খেলছে। কিন্তু এরপর থেকেই তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
রাত একটু গভীর হওয়ার পরও তামিম ঘরে ফিরে না আসায় পরিবারের লোকজনের মনে ভয় ও সন্দেহ জাগে। তারা দ্রুত বাড়ির বাইরে এসে তাকে খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু বাড়ির আশপাশে, প্রতিবেশীদের ঘরে এবং রাস্তার মোড়ে কোথাও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না। এরপর পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় শত শত গ্রামবাসী মিলে টর্চলাইট ও হারিকেন হাতে নিয়ে রাতভর গ্রামের বিভিন্ন স্থানে, বাঁশঝাড়ে এবং ধানখেতে পাগলের মতো খোঁজাখুঁজি করেন। কিন্তু সারারাত অনেক চেষ্টা করেও তারা তামিমের কোনো খোঁজ পাননি। ছেলের চিন্তায় তামিমের মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন।
পরদিন রবিবার (২৮ জুন) দুপুরের দিকে ঘটে আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। কাটাবিল এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ধলাই নদীতে হঠাৎ করে একটি শিশুর নিথর দেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় কয়েকজন মানুষ। তারা দ্রুত কাছে গিয়ে দেখেন সেটি নিখোঁজ হওয়া শিশু তামিম ইকবালের মরদেহ। খবর পেয়ে মুহূর্তের মধ্যেই শত শত স্থানীয় মানুষ নদীর পাড়ে ভিড় জমান। নদী থেকে উদ্ধার করা শিশুটির নিথর দেহ যখন তার বাবা-মায়ের সামনে আনা হয়, তখন তাদের গগনবিদারী কান্নায় চারপাশের পরিবেশ একেবারে ভারী হয়ে ওঠে। একমাত্র সন্তানের এমন মৃত্যুতে পরিবারটিতে এখন শুধু শোকের মাতম চলছে।
আমাদের দেশে প্রতি বছর বর্ষা ও বন্যার মৌসুমে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, যার বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটে গ্রামের পুকুর বা নদীতে খেলতে গিয়ে। এই মৃত্যুগুলো মূলত বাবা-মায়ের অসচেতনতা এবং শিশুদের সাঁতার না জানার কারণেই ঘটে থাকে। সরকার ও বিভিন্ন এনজিও শিশুদের সাঁতার শেখাতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) খরচ করে নানা প্রকল্প হাতে নিলেও, গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে এখনো ১০০% সচেতনতা তৈরি হয়নি।
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। তারা প্রাথমিক তদন্ত শেষে ধারণা করছেন যে, রাতের বেলা অন্ধকারে হয়তো শিশুটি খেলতে খেলতে বা ভুলবশত ধলাই নদীতে পড়ে গিয়ে ডুবে মারা গেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, রাতের বেলা বা বর্ষাকালে নদী বা পুকুরের কাছে শিশুদের একা ছেড়ে দেওয়া কতটা ভয়ংকর হতে পারে। একটু সতর্কতা হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে এমন অনেক নিষ্পাপ শিশুর অমূল্য জীবন এবং রক্ষা করতে পারে একটি সুন্দর ও সাজানো পরিবারকে।














